About Us

 
Search  ...a  page
Main Links

 

কন্যাশিশু দিবস কি এবং কেন?

কন্যাশিশু দিবসের যৌক্তিকত

বাংলাদেশে কন্যাশিশু দিবস প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট

ফোরামের অর্জন

ভবিষ্যৎ করণীয়

 

standing Committee of Forum
 
Recent

 

 
 
 


<< ফোরামের মূলকথা >>


 
গত ২০০০ সাল থেকে আমাদের দেশে শিশু অধিকার সপ্তাহের একটি দিন ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত হচ্ছে। দি হাঙ্গার প্রজেক্টের উদ্যোগে ৬৫ টি বেসরকারী সংস্থা সম্মিলিতভাবে সরকারী সহযোগিতায় কন্যাশিশু দিবস উদযাপন কমিটি নামে দিবসটি উদযাপন সহ নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু এর কার্যক্রমকে আরো জোরদার করার লক্ষ্যে এর একটি সাংগঠনিক রূপরেখা দেয়া প্রয়োজন। গত ১২ জুন তারিখে কন্যাশিশু উদযাপন কমিটির এক সভায় এ সিদ্ধান্ত- গৃহীত হয়।

 

 
  কন্যাশিশু দিবস কী এবং কেন?/কন্যাশিশু  ফোরাম কী

J

 

 


বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে আমরা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত আত্মনির্ভরশীল দেশ নির্মাণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এখনও আমরা কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কারণগুলো খতিয়ে দেখলে দেখা যায় যে, আমাদের চলমান সমাজ ব্যবস্থায় অনেকগুলো বৈষম্য বদ্ধমূল হয়ে আছে। যার মধ্যে নারীর প্রতি বৈষম্য অন্যতম। এ বৈষম্যগুলো অনেকাংশে আমাদের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে।

জন্মলগ্ন থেকেই নারীর প্রতি বৈষম্য শুরু হয়। যেমন - ৫ বছরের কম বয়সী মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে শতকরা প্রায় ১১ ভাগ ক্যালরি কম পেয়ে থাকে। ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে, ছেলেশিশুদের চেয়ে শতকরা ৫০ ভাগ বেশি মেয়েশিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ১৫ বছর অথবা তার বেশি বয়সের মেয়েদের সাক্ষরতার হার ছেলেদের এ হারের তুলনায় শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ কম। ছেলেদের তুলনায় বেশি সংখ্যক মেয়ে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হওয়া সত্ত্বেও মাধ্যমিক স্কুলে মেয়েদের সংখ্যা মাত্র এক তৃতীয়াংশ এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে মাত্র এক চতুর্থাংশ। (সুত্র: ইউনিসেফ, ‘‘বাংলাদেশের শিশু ও তাদের অধিকার,’’ ১৯৯৭, পৃ ৫৪-৫৫)। এ সকল তথ্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্যের চিত্র সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়, যা কোনো সচেতন নাগরিকের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বৈষম্য ছাড়াও কন্যাশিশুরা ব্যাপক হারে নিযর্যাতনের শিকার। যার মধ্যে যৌন নিযর্যাতন পাচার ও সহিংসতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অধিকাংশ কন্যাশিশুই দৈহিক অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে বড় হয়। এ পরিস্থিতি পরিবর্তন অত্যাবশ্যক।

কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের এবং তাদের প্রতি যত্নবান হওয়ার লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে ‘কন্যাশিশু বর্ষ’ পালনের সিদ্ধান্- গ্রহণ করা হয়। ১৯৮৭ সালে কাঠমন্ডুতে অনুষ্ঠিত সার্কের নারী উন্নয়ন বিষয়ক বৈঠকেও কন্যাশিশুদের উপর গুরুত্ব আরোপ করে একটি বর্ষ পালনের জোর দাবি উঠে। ১৯৮৮ সালে পাকিস্-ানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে ১৯৯০ সালকে ‘সার্ক কন্যাশিশু বর্ষ’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্- গৃহীত হয়। ১৯৯০ সালের নভেম্বরে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত সার্কের পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলনে ১৯৯০ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্- দশকটি ‘‘সার্ক কন্যাশিশু দশক’’ হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্- নেয়া হয়। এ সকল সিদ্ধান্-ের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশও যথাযথভাবে ‘কন্যাশিশু বর্ষ’ এবং ‘‘কন্যাশিশু দশক’’ পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।

এ প্রতিশ্রুতি ছাড়াও বাস্তব কারণেই কন্যাশিশুদের প্রতি আমাদের অধিক মনোযোগী হওয়া আবশ্যক। যে নারী শৈশব ও কৈশোরকালে অবহেলিত হয় এবং অপুষ্টিতে ভোগে, পরিণত বয়সে তার পক্ষে সুস্থ-সবল হয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। যার ফলে এদের অনেকেই শিক্ষা, কর্মক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। এমনকি, এদের অধিকাংশই পরবর্তীতে স্বল্প ওজনের শিশু গর্ভে ধারণ করে।

বাংলাদেশে স্বল্প ওজনের নবজাতকের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগের বেশি। এ সকল শিশুরা জন্মলগ্নেই অনেকটা শারীরিক-মানসিক দুর্বলতা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। যার ফলে সে পরবর্তীতে বিকশিত সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। আর এভাবেই আমরা আমাদের জনগণের বিরাট একটি অংশের অর্থনৈতিক অবদান থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছি।

আমরা জানি, শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের অর্ধেক অংশকে - অর্থাৎ কন্যাশিশুদের - পিছনে রেখে জাতি হিসেবে আমাদের পক্ষে সামনে এগুনো সম্ভব নয়। তাই কন্যাশিশুদের অবস্থার পরিবর্তনের উপর আমাদের সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন তাদের জন্য সুযোগ ও সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। তাদের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো। বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন্স সামার্সের () মতে, “কন্যাশিশু খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের বিনিয়োগের সর্বোচ্চ ফেরত প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারে।”

কন্যা শিশুদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ, তাদের সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন ও তাদের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে প্রতি বছর পালিত ‘শিশু অধিকার সপ্তাহ’ এর দ্বিতীয় দিন - অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর “জাতীয় কন্যাশিশু দিবস” ঘোষণা ও পালন করার প্রস্-াব করা হয়। যথাযোগ্য মর্যাদায় ও যথাযথ কর্মসূচির মাধ্যমে এই দিবসটি পালিত হলে জাতি গঠনে কন্যাশিশু তথা নারীদের অবদান যথার্থ স্বীকৃতি পাবে।

অত্যন্- আনন্দের বিষয় যে, এরই প্রেক্ষিতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৩০ সেপ্টেম্বরকে ‘‘কন্যাশিশু দিবস’’ হিসেবে পালন করার আদেশ জারি করে।

 

 

কন্যাশিশু দিবসের যৌক্তিকতা

J

 
বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই নারী। এই নারীরাই জনগোষ্ঠীর সর্বাধিক দরিদ্র অংশ। এই বিরাট সংখ্যক নারীকে বঞ্চিত, অবহেলিত ও অবদমিত করে জাতীয় অগ্রগতি সম্ভব নয়। আগের চেয়ে পরিস্থিতির খানিকটা অগ্রগতি হলেও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণের মাত্রা এখনও প্রান্-িক পর্যায়েই রয়েছে। অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ থেকে আমরা দেখেছি, আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ সৃষ্টিতে নারীরাই হতে পারে মূল চাবিকাঠি। নারীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছাড়া বাংলাদেশীদের জন্য আত্মমর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যত সৃষ্টি সম্ভব নয়। এই গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি থেকেই মূলত: কন্যাশিশুর প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়া একটি কৌশলগত পদক্ষেপ বলে আমরা মনে করি।

জন্মের পূর্ব থেকেই বঞ্চনা, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয় যে কন্যাশিশুরা, তার প্রভাব পড়ে তাদের পরবর্তী সমগ্র জীবনে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, পারিবারিক খাদ্যবন্টন, চিকিৎসা-শিক্ষার সুযোগ এবং সুস্বাস্থ্য বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় যত্নের ক্ষেত্রে ছেলে শিশুর তুলনায় কন্যাশিশুর প্রাধান্য অনেক কম। ফলে কন্যাশিশুরা, বিশেষত তৃণমূল পর্যায়ে অধিকাংশ কন্যাশিশুই পুষ্টিহীনতায় ভোগে। পরবর্তীতে এসকল কন্যাশিশুর শতকরা ৫০ভাগ বাল্যবিবাহের শিকার হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের পরপরই তারা গর্ভধারণ করে। গর্ভকালীণ সময়েও তারা যথাযথ খাবার খায় না বা পায় না। ফলে পুষ্টিহীন মা স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম দেয় এবং এভাবেই পুষ্টিহীনতার দুষ্ট চক্র তৈরী হতে থাকে।

জন্মের পর পরই এসব স্বল্প ওজনের শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্- হয় এবং এদের একটি বড় অংশ অকালে মৃত্যুবরণ করে। যে সকল শিশু বেঁচে থাকে, পুষ্টিহীনতার কারণে তাদের অধিকাংশেরই পূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে না। তারা শারীরিকভাবে দুর্বল ও বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে। ফলে জাতি হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত কাঙিক্ষত উৎপাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হই। ১৯৯৮ সালে ইউনিসেফের একটি হিসেব থেকে দেখা গেছে, পুষ্টিহীনতার হার কমানো না গেলে পরবর্তী দশ বছরে বাংলাদেশ ২,৩০০ কোটি ডলার মূল্যের উৎপাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হবে। আমরা যদি অপুষ্টির এই ভয়াবহ দূষ্টচক্রকে ভাঙ্গতে চাই তবে শিশুকাল থেকেই নারীর স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও পুষ্টির যোগান নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ’আজকের কন্যাশিশুই আগামী দিনের নারী’। তাই কন্যাশিশুর প্রতি সমাজের ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করাই আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। এর মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে নারীদের অবদানের গুরুত্ব জনগণের কাছে আরও সুস্পষ্ট হবে এবং উন্নয়নের কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে কন্যাশিশু দিবস প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট

J


বিশ্বের অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশের সমাজও প্রধানত পুরুষ নিয়ন্ত্রিত। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কন্যাশিশুর জন্ম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনাকাঙিক্ষত। বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় কন্যাশিশুর জন্মকে বাড়তি বোঝা হিসেবে বিরক্তির সাথে গ্রহণ করা হয়। এর পেছনে যে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিটি কাজ করে তা হলো: কন্যাশিশুরা পরিবারের অর্থ উপার্জনকারী নয়, তাই তার শিক্ষা বা কর্মদক্ষতা বাড়ানো অপ্রয়োজনীয়। এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অধিকাংশ সময়েই তাদের শিক্ষাকে ব্যাহত করে অল্প বয়সেই বিয়ে দেয়া হয় বা গৃহস্থালীর কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। ফলে শিক্ষিত, সচেতন, কর্মদক্ষ একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ থেকে তারা অনেকাংশেই বঞ্চিত হয়।

বৈষম্যমূলক সমাজে এবং পরিবারে জন্ম নেয়া কন্যাশিশুদের উপর পরিবার থেকেই শুরু হয় শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন। ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, পাচার, যৌতুকের দায়ে নির্যাতন, হত্যা ইত্যাদি প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে। গত চার বছরের একটি পরিসংখ্যান দেয়া হলো:

বছর ধর্ষনের শিকার নির্যাতন যৌন হয়রানির শিকার এসিড নিক্ষেপ যৌতুকের কারনে নির্যাতন ও হত্যা পাচার ও নিখোঁজ হত্যা অন্যান্য মোট
২০০১ ৪০২ ১১০ ২৩৫ ১৯৭ ৪২ ৮৩২ ৫১৫ ১৪৪৩ ৩৭৭৬
২০০২ ৭৬৯ ১০৭ ৬৯ ১৫১ ৪৫ ১৭৬৮ ৫৮৪ ৪৫৩৬ ৮০২৯
২০০৩ ৬৩৫ ১১৮ ৩৮ ১০৩ ৬১ ১৪৮৫ ৫৩১ ৪২৯৭ ৭২৬৮
২০০৪ ৩৮৫ ২০৩ ৩৮ ৬৬ ২৪২ ১০৩৮ ২৭১ ৩৩৮৩ ৫৬২৬
২০০৫ ১১২৮ ১১০২ ২৪৩ ৫৩ ১০০৩ ১৪১৪ ৭৫৫ ৩০৩৫ ৮৭৩৩
মোট ৩৩১৯ ১৬৪০ ৬২৩ ৫৭০ ১৩৯৩ ৬৫৩৭ ২৬৫৬ ১৬,৬৯৪ ৩৩,৪৩২
সুত্র: বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম ও এমএমসি

উল্লেখিত পরিসংখ্যান নি:সন্দেহে প্রমাণ করে যে, আমরা ভয়াবহ এক বাস্-বতার মধ্যে আছি। এছাড়া, আরও একটি বিষয় এ মূহুর্তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো এইডস এবং এর বিস্-ার, যার সাথে পাচারের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। ‘বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবি সমিতি’র এক গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ হতে পাচার হয়ে থাকে ৯ হাজারেরও বেশী কন্যাশিশু। পাচার হয়ে যাওয়া এইসব কন্যাশিশুর বেশীরভাগই যৌন-পেশায় নিয়োজিত হতে বাধ্য হয় এবং পরবর্তীতে অধিকাংশই এইচআইভি দ্বারা আক্রান্ত- হয়ে নির্মম পরিণতি বরণ করে। এ সকল পরিস্থিতি পরিবর্তনে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অত্যন্ জরুরী।

এই চেতনাবোধকে সামনে নিয়েই শুরু হয়েছিলো ‘কন্যাশিশু দিবস’ উদযাপন। এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত রয়েছে, যা বোঝার জন্য আমরা নিম্নোক্ত ধারাবাহিক ঘটনাবলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করতে পারি-
# কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ এবং তাদের প্রতি যত্নবান হওয়ার গুরুত্ব দীর্ঘদিন ধরে উপলব্ধিতে এলেও মূলতঃ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে প্রথম “কন্যাশিশু বর্ষ” পালনের সিদ্ধান্- গৃহীত হয়।
# ১৯৮৭ সালে কাঠমুন্ডুতে অনুষ্ঠিত সার্কের ‘নারী উন্নয়ন বৈঠকে’ও শিশুদের উপর গুরুত্ব আরোপ করে একটি বর্ষ পালনের জোরালো দাবী উত্থাপন করা হয়।
# ১৯৮৮ সালে পাকিস্-ানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে ১৯৯০ সালকে “সার্ক কন্যাশিশু বর্ষ” হিসেবে পালনের সিদ্ধান্- গৃহীত হয়।
# ১৯৯০- সালের নভেম্বরে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত সার্কের পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলনে “১৯৯০ থেকে ১৯৯৯” পর্যন্- দশকটিকে “সার্ক কন্যাশিশু দশক” হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশও যথাযথভাবে ’কন্যাশিশু বর্ষ’ এবং ’কন্যাশিশু দশক’ পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।  #১৯৯৫ সালে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে নারী উন্নয়নের জন্য যে বারোটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিবেচনা করা হয়েছে তার মধ্যে কন্যাশিশু অন্যতম। কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে কৌশলগত নয়টি লক্ষ্য আর্ন্-জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়। প্রায় ১৯০টির বেশি দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধিগণ এই সকল লক্ষ্য ও সিদ্ধান্-ের সাথে একমত হয়ে গ্রহণ করেন “বেইজিং ঘোষণা” ও “কর্মপরিকল্পনা”। বাংলাদেশও এ ঘোষণায় স্বাক্ষর করে। কতগুলো নির্দিষ্ট বিষয়ে বেইজিং ঘোষণায় স্পষ্ট সংকল্প জানানো হয়। এ অঙ্গীকারনামায় বলা হয়, “২০০০ সালের মধ্যে নারী ও কন্যাশিশুর মানবাধিকার নিশ্চিত করা হবে। দূর করা হবে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া সকল বৈষম্য। বিলোপ করা হবে তাদের বিকাশের সকল বাধা। নারীর উপর থেকে সরানো হবে দারিদ্র্যের বোঝা। তাদের জন্য খুলে দেয়া হবে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ। বিশেষ করে গ্রামের নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো বাড়িয়ে দেয়া হবে। নারী ও কন্যাশিশুদের যথাযথ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করা হবে”। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো যে, এই ঘোষণায় স্বাক্ষর করার পরেও বাংলাদেশে কন্যাশিশুদের উন্নয়নের লক্ষ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মসূচী প্রণয়ন বা পালন করা হয়নি।
# এই বাস্-বতায় দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা ও তাদের বিকাশের বিষয়টিকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে ৪ জুন, ২০০০ কন্যাশিশু দিবস পালনের প্রস্-াব করে। প্রায় ৫৪টি বেসরকারী সংস্থা, সামাজিক সংগঠন এবং কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, যারা কন্যাশিশুর আধিকার রক্ষায় কাজ করেছিলেন তারাও এ প্রস্-াবকে সমর্থন করেন। এরই ফলশ্রুতিতে কন্যাশিশু দিবস উদযাপন কমিটি নামে একটি কমিটি গঠিত হয়।
# কন্যাশিশুর প্রতি মনোযোগী হবার গুরুত্ব তুলে ধরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে ৯ অগাষ্ট, ২০০০ এবং মাননীয় সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বরাবরে ১০ অগাষ্ট, ২০০০-এ কন্যাশিশু দিবস পালন করার জন্য সুস্পষ্ট প্রস্-াব করা হয়।
# ২৮ আগষ্ট, ২০০০-এ এডাবের সহযোগিতায় প্রায় ২৫টি বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালনের নীতিগত সিদ্ধান্- গৃহীত হয়।
#২৯ আগষ্ট, ২০০০ ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামে’র সাথে যৌথভাবে ইউনিয়ন, থানা ও জেলা পর্যায়ে ‘কন্যাশিশু দিবস’ উদযাপনের সিদ্ধান্- গৃহীত হয়।
#অবশেষে, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০০০ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক মশিবিম/শা-৪/শিশু অধিকার-১২/৯৯(খন্ড-১ম)-৫৬৯ এর মাধ্যমে কন্যাশিশু দিবস পালনের আদেশ জারী হয়।
# গত চার বছর ধরে এ দিবসটি যথাযথ মর্যাদার সাথে দেশব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। কন্যাশিশু দিবস উদযাপন কমিটি এ উপলক্ষে বছরব্যাপী কর্মসূচী হাতে নিয়ে থাকে।

 

ফোরামের অর্জন:

J



নারী-পুরুষ বৈষম্যের সংস্কৃতি আমাদের সমাজে সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। কন্যাশিশুর প্রতি বঞ্চনা, এই বৈষম্যেরই আরেকটি বহিঃপ্রকাশ। এই বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকড় সমাজের অত্যন্- গভীরে প্রোথিত। এর উৎপাটন এবং কন্যাশিশুর বিকাশে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার কাজটি একটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া। খুব অল্প সময়ে এ প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান ফলাফল অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সমাজে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম মূলতঃ এ কাজটি করার চেষ্টা করছে। এ কাজের কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই আমাদের সামাজিক জীবনে পড়তে শুরু করেছে। তার কিছু কিছু ইঙ্গিত আমরা প্রত্যক্ষ করছি।
অব্যাহত প্রচারণা ও ধারাবাহিক কর্মকান্ড পরিচালনার ফলে ৩০ সেপ্টেম্বর এখন “জাতীয় কন্যাশিশু দিবস” হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বিগত চার বছরে কর্মশালা, আলোচনা-সভা,র্ যালি, প্রকাশনা ইত্যাদি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সরাসরি প্রায় লক্ষাধিক ব্যক্তিকে এ বিষয়ে তথ্যভিত্তিক ক্ষমতায়নের আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে নিশ্চিতভাবেই সমাজে সচেতনতার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাব্রতী পেশাজীবি সংগঠন কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হয়েছে। ফলে ফোরামের নেটওয়ার্ক-এর বিস্তৃতি ঘটেছে এবং কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৩৮টি সংগঠন এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ৩০৩ টি সংগঠন ফোরামের সাথে যুক্ত হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ ও ফোরামের অন্যান্য সংগঠনসমূহের উদ্যোগে, গত ২০০০-২০০৫ পর্যন্ত- ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে যে সকল কর্মশালা, উঠোন বৈঠক ও দিবস উদযাপিত হয়েছে এর একটি তালিকা নিচে দেয়া হলো:

সাল দিনব্যাপী কর্মশালা (থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়) উঠোন বৈঠক রচনা প্রতিযোগিতা চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা দিবসউদযাপন,মা সমাবেশ ওর্ যালি
২০০০ ৬ ৫০ ৫২ টি এলাকায় ১০৫ টি এলাকায় ১৩৩ টি এলাকায়
২০০১ ১৬ ১৮০ ১০২ এলাকায় ১০২ টি এলাকায় ৩৬৭ টি এলাকায়
২০০২ ২০ ৩১৭ ১৮৯ এলাকায় ১৮০ টি এলাকায় ৩৮৬ টি এলাকায়
২০০৩ ২২ ৩৫৩ ২১২ টি এলাকায় ২১২ টি এলাকায় ৫৫০ টি এলাকায়
২০০৪ ২৮ ৪৬৫ ২৭২ টি এলাকায় ২৭২ টি এলাকায় ৬৩৯টি এলাকায়
২০০৫ ৩১ ৫০৩ ৩০৩ টি এলাকায় ২৯৮ টি এলাকায় ৪৭৫ টি এলাকায়

এসকল কর্মশালায় রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, আইনজীবি, সাংবাদিক, ডাক্তার-সহ সমাজের প্রায় সকল স্তরের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন। কিশোরীদের উপস্থিতিও ছিলো উল্লেখযোগ্য। লক্ষ্য করা গেছে, যেসব অঞ্চলে ফোরাম অধিক সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে, সেসব অঞ্চলে কন্যাশিশুর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে অধিক দ্রুততার সাথে। কন্যাশিশুদের শিক্ষার হার বেড়েছে, ঝরে পড়ার হার কমেছে, অনেক অঞ্চলে বাল্য বিবাহের হার কমে এসেছে। যৌতুক প্রতিরোধে অধিক সচেতনতা ও সক্রিয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এসব অঞ্চলে অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্যাতন প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে। নির্যাতন বিরোধী আইন সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে এবং আইনের আশ্রয় নেবার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। গৃহপারিচারিকা হিসেবে নিয়োজিত কন্যাশিশুদের অধিকার সম্পর্কেও নাগরিক সমাজ যত্নবান হয়েছে। গণমাধ্যমগুলো আংশিকভাবে হলেও কন্যাশিশুদের অধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে নানারকম প্রচারণা জোরদার করেছে এবং কন্যাশিশু দিবস উদযাপনের সংবাদকে গুরুত্বের সাথে পরিবেশন করেছে। এক কথায় বলা যায়, কন্যাশিশুর বিকাশের সার্বিক পরিবেশ এখনও পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও সমাজে এমন কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে যা কন্যাশিশুর জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে। ফোরাম অন্-তঃ এ ব্যাপারে আশার সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছে। এই সাফল্য অনেকের মিলিত প্রচেষ্টায় অর্জিত। কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম ও এর সদস্যরা এ লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্ন কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।
 
ভবিষ্যত করণীয় :

J


#গৃহের অভ্যন্তরে কন্যাশিশুরা যাতে যৌন নির্যাতনের শিকার না হয় সে বিষয়ে যথাযথ সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
# যৌতুকের কারণে এখনও অনেক কন্যাশিশুর জীবননাশ পর্যন্- হচ্ছে। এই বাস্-বতা প্রতিরোধে আপামর জনসাধারনের মধ্যে বাল্য বিবাহ রোধ ও যৌতুক প্রতিরোধের কার্যকর চেতনা গড়ে তুলতে হবে।
# সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য গণমাধ্যম ও প্রচার মাধ্যমকে এ বিষয়টির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
# সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নীতি নির্ধারকদের কন্যাশিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন এবং তাদের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তনের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
#এ বিষয়টি যাতে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয় এবং এর প্রতি সকলের একটি মালিকানা সৃষ্টি হয়, এর ফলাফল হিসেবে মানুষ যাতে স্বত:স্ফূর্তভাবেই কাজটি করতে এগিয়ে আসে ও দায়িত্ব গ্রহণ করে, এ লক্ষ্যে কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে,
#বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ফোরামের কার্যক্রমকে বিস্তৃত করতে হবে।
# প্রচারাভিযান কার্যক্রমগুলি মালিকানার ভিত্তিতে ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে পরিচালনা করার জন্য ছাত্র/ছাত্রীদেরকে এর সাথে আরও জোরালোভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
#রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কন্যাশিশুর অধিকার ও সুরক্ষাজনিত সমস্যাগুলোকে অধিকতর গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনতে হবে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও আইনের সংস্কার করতে হবে। নুতন আইন প্রণয়নের বিষয়ে জোরালো এডভোকেসি করতে হবে।
# স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ইউনিয়নব্যাপী প্রচারাভিযান, কর্মশালা করতে হবে যাতে করে কন্যাশিশুদের প্রতি সকল প্রকার বঞ্চনা, বৈষম্য ও নির্যাতন বন্ধ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়। ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিচালিত নানামুখি কার্যক্রমের সাথে কন্যাশিশুদের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।
    Ç
     

National Girl Child Advocacy Forum

Contact Us

3/7 Asad Avenue Mohammodpur, Dhaka-1207

Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975, Fax-(880-2)8116812, E-mail-thpb@bangla.net