|
‘উত্ত্যক্তকারীর শাস্তি
কন্যাশিশুর মুক্তি’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এ
বছর ১৫ই অক্টোবর, ২০০৮ জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত
হচ্ছে৷ আমাদের দেশে মেয়েরা জন্মের পর নিজ ঘর থেকেই
নানা বৈষম্যের শিকার হয়৷ এই বৈষম্য শিক্ষায়,
স্বাস্থ্যক্ষেত্রে, এমনকি খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক
চর্চাতেও৷ কৈশোরে মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা ও
নির্যাতন এদেশের একটি প্রধান সমস্যা৷ এছাড়া
যৌতুকের জন্য নির্যাতন, এসিড সন্ত্রাস, ধর্ষণ,
খুন, অপহরণ, বাল্যবিবাহ, জোরপূর্বক বিয়েসহ
কন্যাশিশুদের প্রতি নানারকম নির্যাতন সমাজে
বিদ্যমান৷ এসব সমস্যার মাঝে উত্ত্যক্ততাও একটি
গুরুতর সমস্যা৷
উত্ত্যক্ততার সীমারেখা নির্ণয় করা খুব কঠিন৷ তবে
সাধারণত অশ্লীল মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি করা, অশ্লীল
গান বাজানো বা গাওয়া, ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সিগারেটের
ধোঁয়া দেয়া, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কিছু করা ও
পিছু নেয়া, অশ্লীলভাবে প্রেম নিবেদন বা বিয়ের
প্রস্তাব দেয়া, পথ রোধ করা, প্রস্তাবে সাড়া না
দিলে হুমকি দেয়া, নাম ধরে চিৎকার করা, বিরক্ত করা,
কোন কিছু ছুঁড়ে ফেলা ইত্যাদি উত্ত্যক্ততার আওতায়
পড়ে৷ তবে এর প্রকার, ধরণ এবং ভয়াবহতা দিনদিন
পাল্টাচ্ছে৷
উত্ত্যক্ততার ইতিহাস বহু যুগ থেকেই দেশে-দেশে
বিদ্যমান৷ তবে অতীতে তা উঠতি বয়সের যুবকদের দ্বারা
স্কুল-কলেজের মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মধ্যেই
সীমাবদ্ধ ছিল৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লন্ডনের
স্টেশন পাড়ায় বেড়ে ওঠা বখাটে হতাশ বেকার যুবকদের
দ্বারা উত্ত্যক্ততা প্রথমবারের মত একটি ব্যাপক
সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয় এবং লন্ডনের জনসাধারণ এর
বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্যে দিয়ে এই
সমস্যা প্রতিহত করতে সমর্থ হয়৷
উত্ত্যক্ততা নামক নির্যাতনটি ব্যাপকতা এবং ভয়াবহতা
এশিয়ার দেশগুলিতে বিশেষ করে বাংলাদেশে ব্যাপক৷
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘উত্ত্যক্ততা’র কোন
সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেয়া হয়নি এবং কী কী কার্যাবলী এর
আওতায় পড়বে তা নির্ধারণ করা হয়নি৷ ২০০০ সালে “নারী
ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে” উত্ত্যক্ততা সংক্রান্-
কার্যাবলীকে যৌন হয়রানী বিবেচনায় আইনগত অপরাধ
হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির বিধান করা হয়৷ কিন্তু
আইনটি অপব্যবহার ও মিথ্যা মামলা দায়েরের অজুহাতে
২০০৩ সালে এতে একটি সংশোধনী আনা হয় সেখানে
উত্ত্যক্ততা সংশ্লিষ্ট ১০(২) ধারাটি পুরোপুরি
বিলুপ্ত করা হয়৷ বস্তুত ২০০৩ সালের সংশোধনীতে
মানসিক নির্যাতনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধের সম্পূর্ণ
বাইরে রাখা হয়েছে৷ অথচ এই নির্যাতনের কারণেই বন্ধ
হচ্ছে অনেক মেয়েদের স্কুল যাওয়া, বাড়ছে আত্মহত্যার
প্রবণতা৷ সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্য হতে জানা যায়
পাড়ার বখাটে ছেলেদের নিয়ন্ত্রণহীন উৎপাতে গত ৪
বছরে ২৮ কিশোরী আত্মহত্যা করেছে৷ আর ২০০৭ সালে
উত্ত্যক্ততার কারণে আত্মহত্যা করেছে ৫ জন, যাদের ৪
জনেরই বয়স ১৩-১৮ বছরের মধ্যে৷ কিন্তু আত্মহত্যার
পরেও ২০০৭ সালে এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে মাত্র
৩টি৷
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৬ ধারায় বলা হয়েছে,
অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র শিশুর বেঁচে থাকার এবং
উন্নয়নের জন্য যথাসম্ভব সর্বাধিক নিশ্চয়তার
ব্যবস্থা করবে৷ অথচ দেখা যায়, আমাদের দেশে ১৮
বছরের কম বয়সী মেয়েরা উত্ত্যক্ততার শিকার হয়
সবচেয়ে বেশি৷ অর্থাৎ উত্ত্যক্ততার কারণে
কন্যাশিশুদেরই বেঁচে থাকার অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে
সবচেয়ে বেশি৷
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫.২ শতাংশই হলো ১৫
বছরের কম বয়সী শিশু৷ যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক (৪৮%
ভাগ) কন্যাশিশু৷ তাদেরকে পিছিয়ে রেখে আমাদের জাতির
উন্নয়ন সম্ভব নয়৷ কন্যাশিশু তথা সমগ্র নারী জাতির
স্বাভাবিক বিকাশের স্বার্থে আমাদের এখনই প্রয়োজনীয়
উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত৷ তাই জাতীয় কন্যাশিশু দিবসে
আমাদের জোর দাবি:
উত্ত্যক্ততাকে একটি অপরাধ বলে গণ্য করতে হবে৷ আর
এজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যা যা করণীয়-
- পরিবারকে সচেতন হতে হবে;
- এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও কার্যকরি আইন প্রণয়ন করতে
হবে;
- আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে অধিক তৎপর ও
কার্যকরি হতে হবে এবং ভিকটিমদের প্রয়োজনীয় আইনি
সহায়তা দিতে হবে;
- উত্ত্যক্ততার শিকার নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য
যথাযথ কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করতে হবে;
- বিষয়টি জেন্ডার পলিসিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে;
- পরিবার ও সমাজে ছেলে-মেয়ের বৈষম্য কমিয়ে এনে
মনোসামাজিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে এবং পাশাপাশি
মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রশিক্ষণ দিতে হবে;
- উত্ত্যক্ততার বিষয়টিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ
দিতে হবে;;তার বিষয়টিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ
দিতে হবে;
- মেয়েদের আরও সাহসী ও প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করতে
হবে;
- নিয়মিত উত্ত্যক্ততা বিষয়ক উঠান বৈঠক, আলোচনা
সভা, স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন
প্রকাশনার মাধ্যমে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে৷
|