|
Publications-Kannashisu
3 |
|
|
| Main Links |
|
|
|
standing Committee of Forum |
| |
|
Recent |
| |
| |
| |
|
Last Update - 07 June, 07
|
|
|
|
মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু - আর সে যদি হয় কন্যা তবে?
লতিফা আকন্দ*
|
|
মানসিক প্রতিবন্ধকতা আমাদের মাঝে একটি বিশেষ নেতিবাচক অবস্থান।
শুধু মানুষের নয়, প্রতিবন্ধকতা সকল জীব জগতেও বিদ্যমান। আমার
আজকের লেখার উপলক্ষ আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর, জাতীয় কন্যাশিশু দিবস
উদ্যাপনের ভাবনা নিয়ে। আমরা মায়েরা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর,
শারীরিক, মানসিক নানা রকম পরিবর্তিত অবস্থানে নিজেকে সমর্পণ করে
নির্দিষ্ট সেই প্রসবকালীন ব্যথা বেদনা উপলব্ধির অভিজ্ঞতা সয়ে
একটি সন্-ানের জন্ম দেই। কখনও কখনও সেই নবজাত শিশুটি স্বাভাবিক
ও সুস্থ নাও হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে যে অসুস্থতা চোখে পরে, তা
তার দৈহিক গঠন, অঙ্গপ্রতঙ্গের অস্বাভাবিক অবস্থান বা অঙ্গহানি,
বিকলাঙ্গ ইত্যাদি। শিশুটির মানসিক প্রতিবন্ধকতা প্রথমে ধরা পরে
মায়ের কাছে, পরবর্তীতে অন্যরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়। মা
লক্ষ্য করেন শিশুটি ঠিক বয়সে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বিকশিত
হচ্ছে না। তার দৃষ্টিতে দৃষ্টি বিনিময় নেই, ভাষা নেই। বাক্য
স্ফুরণও হয়তো তার বিলম্বিত, নয়তো ভাষাহীন। আবার বোধগম্যতা এবং
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবহারে সমন্বয় নেই। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে
মোটামুটি সুস্থভাবে বেড়ে উঠলেও মানসিক বুদ্ধির উন্মেষ হয় না।
এই মানসিক ভারসাম্যহীন অসঙ্গতিকে কিছুদিন আগেও লোকে ‘পাগল’ বলে
সম্বোধন করতো। আসলে এটি একেবারে ভুল। অশিক্ষিত দরিদ্র গ্রাম
বাংলার ঘরে জন্মালে তাদেরকে ওঝা, পীর বা ঐ ধরণের অনেকের অনেক
ফর্মুলার অত্যাচার সহ্য করতে হতো। কেউ কেউ এতে মারাও যেত। গত
শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে উন্নত বিশ্বে মানসিক প্রতিবন্ধী
শিশুদের উপর বিভিন্ন গবেষণা চলছে। এদের বুদ্ধিবিহীন বিশেষ
শ্রেণিভুক্ত করে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সুযোগ রাষ্ট্রীয়ভাবে বা
স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে দেওয়া হয়। আমাদের দেশে এই সমস্যা
চিহ্নিত হওয়ার পর একেবারে শহরকেন্দ্রিক গুটি কয়েক প্রশিক্ষণ
কেন্দ্র খোলা হয়েছে। উল্লেখ্য, তিন যুগ আগে মানসিক প্রতিবন্ধকতা
বিষয়ে বিদেশে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে যিনি ঢাকার ইস্কাটনে প্রথম
কেন্দ্রটি খুলেছিলেন ড. সুলতানা সারওয়াত আরা জমান। নরওয়ের
অনুদানপুষ্ট ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় কেন্দ্রটি দ্রুতগতিতে
প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা লাভ করলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্-
উল্লেখযোগ্যভাবে তেমন কোন সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে নি। ড.
জমান স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন মানসিক প্রতিবন্ধী কন্যার সুশিক্ষিত
একটি মাকে তার সহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এটিই ছিল
আমাদের দেশে এ ধরণের প্রশিক্ষণের প্রথম পদক্ষেপ। ড. জমানের
সহযোগী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মহিলাটি ছিল আমারই অতিপ্রিয়
প্রতিবেশী মিসেস জোহরা রহমান। কয়েক বছর আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন।
মানসিক প্রতিবন্ধী জগতে তিনি এক অনবদ্য অবদানের প্রতীক আছেন।
ড. জমান আজও ঐ কাজে নিবেদিত প্রাণ। ড. সুলতানা জমানের
প্রচেষ্টায় ১৯৮০-এর দশকে ইস্কাটন এলাকায় কল্যাণী’র সঙ্গে
অনুরূপ অপর একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যা, ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য,
প্রতিবন্ধকতার প্রসারিত ক্ষেত্রে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দেশ
বিদেশে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছে এবং প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রটির জন্য
নিজস্ব ভবন গড়ে তুলেছে। উচ্চবিত্তের বহু প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়ে
শিক্ষার্থী নানারকম দক্ষতা অর্জন করে অন্-ত স্বনির্ভর জীবনের
দিকে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। এমনকি উৎপাদনশীল নাগরিক হয়েও উঠছে।
ঢাকার বাইরে ‘কল্যাণী’র বেশ কয়েকটি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে এর সংখ্যা একবারে নগণ্য। প্রশিক্ষণ ও
গবেষণা দ’ুটিই ব্যয় সাপেক্ষ বিধায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রসার নেহাতই
কম।
বর্তমানে ‘মানসিক প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু’ এই প্রবন্ধটির আলোচ্য
বিষয়বস্তু গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যান নির্ভর হলেও এখানে বিস্-ারিত
লিখে প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধির সুযোগ নেই। তাই বিষয়টির উপর
গণসচেতনতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী
কন্যাশিশুতে সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে, যদিও এর গুরুত্ব, প্রভাব,
পরিবারে-সমাজে-রাষ্ট্রে অনেক বেশি। ডঐঙ-র হিসাবে সামগ্রিকভাবে
জনসংখ্যার দশভাগ কোন না কোন প্রতিবন্ধীতার শিকার। বাংলাদেশের
মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ থেকে ২৪ শতাংশই ১৫ বছরের কম বয়সী কিশোর
কিশোরী। এর প্রায় অর্ধেক কন্যাশিশু। এই কন্যাশিশুর একটি অংশ
আবার মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার। আগেই উল্লিখিত ঢাকার ইস্কাটন
এর ঝড়পরবুঃ ঋড়ৎ ঞযব ওহঃবষষবপঃঁধষষু উরংধনষবফ (ঝডওউ) ইধহমষধফবংয
নামটি কয়েক বছর পূর্বে ছিল ঝড়পরবুঃ ভড়ৎ ঃযব ঈঅজঊ ধহফ বফঁপধঃরড়হ
ড়ভ ঃযব সবহঃধষষু ৎবঃধৎফবফ, ইধহমষধফবংয প্রায় ত্রিশ বছর হচ্ছে
এই প্রতিষ্ঠান ইস্কাটনের রাস্-ার উভয় পাশে একটি কমপ্লেক্সে
প্রতিবন্ধী শিশুদের (ছেলে-মেয়ে)। বর্তমানে রাজধানীর মিরপুরে আরো
একটি কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছে। এ কমপ্লেক্সেও ছেলে-মেয়ে উভয়ের
প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এরূপ আরো অনেক শিক্ষাকেন্দ্র
দেশব্যাপী গড়ে ওঠা দরকার।
এখন মূল বিষয়বস্তুতে অর্থাৎ মানসিক প্রতিবন্ধী যখন কন্যাশিশু
হয় তখন অবস্থা কী দাঁড়ায়- এ বিষয়ে আলোচনা করা যায়। সমাজে নারী
পুরুষের যে বৈষম্য সর্বত্র বিরাজমান তা প্রতিবন্ধী
কন্যাসন্-ানের বেলায় অনেক বেশি প্রকট ও ভয়াবহ। এ বৈষম্যের চাপ
দু’রকমের। প্রথমত, কন্যা হয়ে জন্ম নেয়া তার অপরাধ, শুধু তার নয়
তার বাবা মায়ের বিশেষ করে মা যেন কন্যাশিশু জন্ম দেওয়ার জন্য
সেই দম্পতির অপরাধী একজন। দ্বিতীয়ত, কন্যা যদি মানসিক
প্রতিবন্ধী হয়, পুরো সংসারে ভাঙ্গন ধরে ভূমিকম্পের পরের
অবস্থার মত। অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্কের সুস্থতাও
বিপর্যস্- হয়। মা এবং পরিবারকে এক ধরনের সমাজ বিবর্জিত একঘরে
হতে হয়। পরিবারের অন্য সুস্থ স্বাভাবিক কন্যারও বিয়ের ক্ষেত্রে
সমস্যা হয়। ফলে ঐ মানসিক প্রতিবন্ধী কিশোরী কন্যাকে সবার
অলক্ষ্যে বাড়ির কোনা কানিতে নিঃশব্দে একাকীত্বে যন্ত্রণাদগ্ধ
জীবন যাপন করতে হয়। কোন অতিথি আগন্তুকের সামনে যেন সে না আসে
সেই ব্যবস্থা বা সতর্কতা অবলম্বন করে পরিবার। পরিবারের এসকল
কন্যাশিশু আমাদের ঘরে আলোকিত করে বরং অন্ধকারে নিজেকে লুকিয়ে
রাখে। সে চরম উপেক্ষিত হয়। কন্যা হয়ে জন্ম নিলে পরিবারের বোঝা,
আর প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিলে বোঝার উপর শাকের অাঁটি।
চিকিৎসকগণ এই গোষ্ঠিকে বুদ্ধির স্বল্পতা অনুযায়ী শ্রেণি বিভাগ
করে থাকেন। এক কথায়, গোটা বিভাজন ঞৎধরহধনষব (প্রশিক্ষণযোগ্য)
ধহফ হড়হ-ঃৎধরহধনষব (প্রশিক্ষণ অযোগ্য)। যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণে
অসমর্থ তারা অন্যের সাহায্য নির্ভর। তার সকল কাজ অপরকে করে দিতে
হয়। কিন্তু যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণে সমর্থ তাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ
বা বধৎষু রহঃবৎাবহঃরড়হ দ্বারা আত্মনির্ভর এমনকি উৎপাদনশীল
উপযোগী অনেক কাজ শেখানো সম্ভব। এরা সহায়ক পরিবেশে প্রশিক্ষণ
পেলে উপার্জন পর্যন্- করতে পারে। তাছাড়া এরা অতি নিপুণতার সঙ্গে
অনুকরণে পটু। যেমন: নাচ, গান হস্-শিল্প ইত্যাদি যা শেখানো যায়।
এ বিষয়ে সরকারের নীতি প্রণয়ন এবং জনগণের সহানুভূতি প্রয়োজন।
একথা স্মরণযোগ্য এরাও জাতির সদস্য, সুযোগ্য নাগরিক এবং
সম্ভাব্য ভোটার। সকল রকম সুযোগ পাওয়া তাদের অধিকার, করুণা নয়।
মানসিক প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু সকল রকম প্রতিবন্ধকতার চেয়েও বেশি
ভুক্তভোগী। আবার এরাই সবচাইতে বেশি অবহেলিত। এদের পঞ্চ
ইন্দ্রীয় থেকেও নেই। কারণ তাদের নিয়ন্ত্রণের কোন মন নেই। তাদের
নিজের চাহিদা বুঝার ক্ষমতাও নেই। তাদের স্বার্থরক্ষা এবং
উন্নয়ন অন্য দরদী মনের উপর বর্তায়, তথা পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র।
তাদের সকলের অগোচরে প্রায় সরীসৃপসম লোকচক্ষুর অন্-রালে আড়ালে
আবডালে রাখা হয়। তারা শৈশব স্বপ্ন বঞ্চিত, কৈশোরেও কাটে ... এই
গঠনমূলক সময়টি কন্যার বেলায় একেবারে উপেক্ষিত। তারা নিজ
বুদ্ধিতে চালিত যে কোন দায়িত্ব গ্রহণে ব্যর্থ বিধায় পরিবারে
লাঞ্ছিত এবং ব্যতিক্রমী শ্রেণি হয়ে বোধজ্ঞানহীন জীবন যাপন করে।
সমস্যা সবচেয়ে কঠিন হয় বয়ঃসন্ধির সময়। এই সময়ে শারীরিক ও
মানসিক স্বাভাবিক পরিবর্তনে তাদের কোন পূর্ব প্রস্তুতি থাকে
না। তারা কিছুই বোঝে না। ফলে তাদের নিয়ে পরিবারের দুর্ভাবনা
হাজার গুণ বেশি। এদের বয়স বাড়তে থাকে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে,
বাল্য-কৈশোর-যৌবন এদের ‘শরীরে’ ভর করে, ‘মনে’ করে না। যদিও
প্রকৃতির নিয়মের জৈবিক প্রয়োজন তার মধ্যেও লক্ষণীয় হয়- যেমন হয়
জীব জগতের মধ্যে। এ সময় তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা বাঞ্ছনীয়।
সাম্প্রতিককালে প্রতিবন্ধী জগৎ আমাদের দেশে কিছুটা উন্মোচিত
হয়েছে। সচেতনতাও বেড়ে চলেছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাতে গোনা।
তাও সরকারি খাতে বেশি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়ন ক্ষেত্রে
অর্থাৎ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, সামগ্রিক নারী নির্যাতন বন্ধ,
নারী পাচার, পাচারকৃত নারী বা শিশু পুনর্বাসন, প্রভৃতি
ক্ষেত্রগুলোকে নিয়ে বৃহৎ পরিসরে কাজ করলেও প্রতিবন্ধী শিশুদের
নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম। তারপরও বেশ
কয়েকটি সংস্থা প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও স্বাবলম্বী করার বিষয়গুলো
নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে
এটিও রাজধানী ও রাজধানীর বাইরের শহরগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুদের সমস্যা আরও গুরুতর হলেও এদের জন্য
আলাদা কোন প্রতিষ্ঠান আজও নেই। এরা একবারে অবহেলিত। এরা বেশির
ভাগ সময় বিশেষ করে পরিবারে একেবারে নির্যাতিত এবং অবহেলার জীবন্-
শিকার। ধীরে ধীরে এরা ঝরে যায় সবার অলক্ষ্যে। হাহাকার আপসোস
কেউ তেমন করে না। তাদের মৃত্যু সব সময় সবার জন্য হাফ ছেড়ে বেঁচে
যাওয়ার মতো। অথচ সময় মতো অর্থাৎ একেবারে বাল্যকালে তাদের স্ব
স্ব ক্ষমতা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিলে তারাও শুধু আত্মনির্ভর নয়,
উপার্জনক্ষমও হতে পারে। পাশের দেশ ভারতে তাদের হাতে তৈরি জিনিস
সরকার বেশি খরিদ ও বিক্রি করা দায়িত্ব মনে করে এবং সেদেশের
জনগণও। আমাদের দেশে অনুরূপ পরিবেশ অনুপস্থিত। এক্ষেত্রে আমাদের
এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে তারা আমাদেরই একজন। যে কোন মা এ
ধরনের প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু জন্ম দিতেই পারে এবং একাধিক কারণ
আছে এমন শিশু জন্মাবার। বিশেষ করে আমাদের মত দরিদ্র শিক্ষাহীন
সংস্কারে আবদ্ধ দেশে পুষ্টিহীনতার শিকার প্রায় সকল শিশু।
কন্যাশিশু তো বৈষম্যের প্রতীক, আর সে কন্যা যদি প্রতিবন্ধী হয়
তবে সে সব দিক থেকে দুর্ভাগা।
বেশ কিছুদিন আগে ‘দৈনিক প্রথম আলো’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর
পড়ে মন ভেঙ্গে যায়। দরিদ্র বাবা অর্থ লোভে নিজের মানসিক
প্রতিবন্ধী মেয়েকে উৎসর্গ করেছিল। ১৬ আগস্ট, ২০০৭ প্রথম আলোর
আরেকটি শিরোণামে দেখে শিহরিত হতে হয়। শিরোণামটি এইরূপ
“সীতাকুণ্ডে ধর্ষণের শিকার প্রতিবন্ধী কিশোরীর সন্-ান প্রসবকালে
মৃত্যু।” এ ধরনের ঘটনা প্রায়শ হলেও পত্রিকায় বা কোন সংবাদ
মাধ্যমে তেমন প্রকাশিত হয় না। তাদের বেঁচে থাকার অধিকার,
মানবাধিকার, তার প্রতি নিষ্ঠুরতা সামাজিক দৃষ্টিতে এবং আইনত
নিকৃষ্টতম অপরাধ। নির্বোধ মানসিক প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু অনেক
সামাজিক ব্যাধিরও সাম্ভাব্য শিকার হতে পারে, যেমন- ঐওঠ, অওউঝ;
মাদকাসক্তসহ আর কোনো অস্বাস্থ্যকর অপরাধে লিপ্ত হওয়া।
আন্-র্জাতিক মানব উন্নয়নের সকল দলিলে এদের অধিকার উল্লিখিত আছে
কিন্তু বাস্-বে প্রতিফলন নেই। আজও সেই আশির দশকের ঈড়হাবহঃরড়হ
ড়হ ঃযব ৎরমযঃং ড়ভ ঃযব পযরষফ সংক্ষেপে ঈজঈ যেটা আমাদের রাষ্ট্র
স্বাক্ষরকারী এবং পরবর্তীতে ৎধঃরভুও করেছে। ঈড়হাবহঃরড়হ ড়হ ঃযব
ঊষরসরহধঃরড়হ ড়ভ ধষষ ভড়ৎসং উরংপৎরসরহধঃরড়হ অমধরহংঃ ডড়সবহ (ঈঊউঅড);
আছে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন, মানব ও শিশু অধিকার সম্পর্কীয় আরও
কত সংস্থা যেমন টঘওঈঊঋ, টঘওঋঊগ ইত্যাদি। প্রসঙ্গত আমাদের আছে
সরকার ঘোষিত নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, যৌন হয়রানি,
এসিড নিক্ষেপ ইত্যাদি বিরোধী আইন। কিন্তু আইনের সঠিক প্রণয়ন ও
প্রয়োগের অভাবে অবস্থা রয়ে যায় কম বেশি অপরিবর্তিত। সবচেয়ে বেশি
আপামর জনসাধারণের শিক্ষা, সচেতনতার চরম অভাব- তার উপর আছে
লিঙ্গ বৈষম্য ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের সর্বক্ষেত্র। সার্বিকভাবে
নারী নির্যাতনের রাষ্ট্রীয় আইনের দু-চারটি এখানে উল্লেখ করা
যেতে পারে। ঠরড়ষবহপব ধমধরহংঃ ড়িসধহ ধহফ পযরষফৎবহ অপঃ, ঞযব উড়ৎিু
চৎড়যরনরঃরড়হ অপঃ, ঞযব ঈযরষফ গধৎৎরধমব জবংঃৎধরহঃ অপঃ, ঞযব অপরফ
ঈৎরসব ঈড়হঃৎড়ষ অপঃ এসকল আইন ও অধিকতর আইনের প্রয়োজনীয়তা জনগণের
অজ্ঞাত। আর উরংধনষব বা প্রতিবন্ধীদের জন্য সে রকম কোন
নির্ভরযোগ্য বিশেষ আইন কোথায়? প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুর অবস্থান
এক্ষেত্রে একেবারে অবহেলিত। এদের অভিভাবকের আইনের কাছে পৌঁছানো
দুরূহ- আছে এ বিষয়ে অজ্ঞতা এবং প্রকাশে অনিচ্ছুক কারণ বহুবিধ-
লজ্জা, ভয়, জন্ম দেবার অহেতুক অপরাধবোধ, অন্য সুস্থ সন্-ানদের
ভবিষ্যতের ভাবনা। মানসিক প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু নানা ভাবে
নিষ্ঠুরতার শিকার হলেও তার মর্যাদাবোধ ভীতি থেকে লজ্জা কিছুই
থাকে না বলে ইয়াসমিনদের মত আত্মহত্যার চিন্-াও নেই। অবহেলায়
তারা প্রায়শ ঝরে পরে। উল্লেখ্য, মানসিক প্রতিবন্ধীর অনুভূতি যে
একেবারে নেই তা ঠিক নয়- যা তাবৎ জীব জগতের জন্য প্রযোজ্য। কয়েক
বছর আগে মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য স্পেশাল অলিম্পিক অনুষ্ঠিত
হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাতে অবস্থানকালে মাসাধিক কালব্যাপি
তাদের ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তখন তাদের নানা রকম
মানসিক এবং জৈবিক পিপাসা, কোমল অনুভূতি, মায়ের প্রতি টান
ইত্যাদি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। প্রতিটি খেলা শুরু হওয়ার আগে
মানসিক প্রতিবন্ধী খেলোয়ারদের কৌশল হিসেবে দেশে ফোন করানো হতো।
ফলে তারা অনেক পুরস্কার দেশের জন্য অর্জন করে।
এখানে দু-একটি সুপারিশ করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র মানসিক
প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুর জন্য। এ অঙ্গনটি এতই ব্যতিক্রম যে এর
জন্য ব্যতিক্রমধর্মী চিন্-া ভাবনা এবং আলাদা প্রতিষ্ঠান দরকার।
এসকল প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রয়োজনে হোস্টেল বা আবাসিক ব্যবস্থা
করতে হবে। কারণ এদের প্রশিক্ষণ দিতে হলে আলাদা আধুনিক ঃবপযহরপধষ
বয়ঁরঢ়সবহঃ দরকার তাদের নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সামলানো এবং
বিনোদনের জন্য।
তাদের ভবিষ্যত ভাবনায় অভিভাবকদের অবর্তমানে এদের অবস্থা চিন্-া
করে এক অনিশ্চয়তায় সময় কাটে। এজন্য স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে
‘আইনজীবী সংঘ’ বা স্থানীয় সামাজিক প্রতিনিধি সমন্বয়ে কার্যকরী
প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। যেন তারা তাদের অভিভাবকের অবর্তমানে
বা কোন দুর্ঘটনায় তাদের সর্বত্রভাবে সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে পারে।
তাদের প্রতি দরকার সংবেদনশীল সমাজ ও সচেতন মনোভাব। এমন শিশু
আমার ঘরেও জন্মাতে পারতো।
শেষ কথা, প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুর দৃশ্যমানতা বহুল পরিমাণে
বর্ধিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য সকল
প্রচার মাধ্যমকে (সরকারি এবং বেসরকারি) দায়িত্ব নিতে হবে।
সমাজের অবাঞ্চিত এই লুক্কায়িত মানবগোষ্ঠী তার ন্যায্য অধিকার
থেকে যেন বঞ্চিত না হয়। আমাদের ভাবতে হবে প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু
আমাদের লজ্জা নয়, বোঝা নয় আমাদের অহংকারও হতে পারে। |
|
|
|
|
|