ড. আতিউর রহমান অর্থনীতিবিদ
এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (বিআইডিএস)
সম্প্রতি
এক ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছিলো বাংলাদেশ৷
মোট ভূ-খন্ডের প্রায় অর্ধেকই পানির নিচে চলে গিয়েছিলো৷
পানি নেমে গেছে, তবে ঢাকা শহরের আশেপাশের জায়গাজমি ও
জলাঞ্চল ভূমিদস্যুদের
দখলে চলে যাবার কারণে পানি সেভাবে দ্রুত নামতে পারেনি৷
ফলে ঢাকায় জলাবদ্ধতা এক তীব্র রূপ নিয়েছিলো৷
ঢাকার পরিবেশ মারাত্মক হুমকরি মুখে পড়েছিলো৷
দুর্গন্ধময় এক পরিবেশে মানুষের জীবন কেটেছে৷
স্যানিটেশন ও খাবার পানির সমস্যায় মানুষের জীবন
দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিলো৷
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি
পানির নিচে চলে যাবার কারণে শ্রমিকদের কাজও বন্ধ হয়ে
গিয়েছিলো৷
তবে ঢাকার বাইরে চর ও হাওড় অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির
ব্যাপক অবনতি ঘটেছিলো৷
তাছাড়া, সিলেট সহ বেশ কিছু অঞ্চলে বন্যার আক্রমণ খুবই
তীব্র ছিল৷
বন্যার ক্ষয়ক্ষতি
নিয়ে সরকারী ও বেসরকারী মহলে যখন তীব্র বিতর্ক চলছে,
তখন একটি কথা কেউ খেয়াল রাখছে না যে, সকল শ্রেণীর
মানুষ একই রকম বিপদে পড়ে নি৷
যাদের আয় সামান্য, জমিজমা অল্প এবং ঘরবাড়ি কাঁচা তাদের
দুরাবস্থা অন্যদের চেয়ে বেশ বেশী ছিল এবং এখনও আছে৷
এদের এবং বন্যার্ত আরও অনেক নিম্নআয়ের পরিবারে নারীর
অবস্থা বন্যার সময় এবং বন্যাত্তোর সময়েও অধিক
ঝুঁকিপূর্ণ৷
সাধারণত সংকট এলে গরীব এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের মানুষ
দু'ভাবে তা মোকাবেলার চেষ্টা করেন৷
প্রথম তারা কম খরচে কোনোমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন৷
তিন বেলার জায়গায় দুবেলা, দুবেলার জায়গায় এক বেলা
খাওয়া, পেটপুরে না খেয়ে আধ পেট খেয়ে কোনোভাবে বেঁচে
থাকার চেষ্টা করেন৷
এক্ষেত্রে
বৈষম্য লক্ষ্য
করবার মতো৷
বাড়ির কর্তার জন্য এরমধ্যেও মোটামুটি ভালো পরিমাণ
খাবার জোটে৷
ছেলে সন্তানও ভালোই খাবার পায়৷
কন্যাসন্তানেরা তাদের ভাইদের চেয়ে কম খাবার পায়৷
আর ঘরের গৃহিনীর কপালে কখনও খাবার জোটে, কখনও বা না
খেয়েই থাকতে হয়৷
এ কারণেই বন্যার সময় বা তার পরপরই ডায়রিয়া, ভাইরাল
জ্বর, সর্দ্দিকাশির প্রকোপ পুরুষদের চেয়ে নারীদের
মধ্যে বেশি করে দেখা যায়৷
বিশেষ করে কমবয়সী কন্যাশিশুদের
এ সময়টায় খুব করে অসুখ বিসুখে পড়তে দেখা যায়৷
এরা অপুষ্টির শিকার হয় বলে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাও
তাদের কম৷
তাই অসুখ বিসুখও তাদেরই হয় বেশি৷
সে কারণেই দেখা যায় যে, বন্যার পর পরই কন্যাশিশুর
মৃত্যুর
হার বেড়ে যায়৷
তাই বন্যা পরবর্তী
পুর্নবাসন কর্মসূচির পরিকল্পনা গ্রহণের সময় শিশুদের,
বিশেষ করে কন্যাশিশুদের
অপুষ্টির সমস্যাটির কথা ভালো করে মাথায় রাখতে হবে৷
বন্যার সময়ও আমরা দেখেছি যে, শিশুদের
জন্য আলাদা করে ত্রাণের ব্যবস্থা সেভাবে করা হয়নি৷
পরিবারের জন্য চাল বা রুটি দেয়া হলেও শিশুদের
জন্য দুধ বা বিস্কুট দেবার উদ্যোগ খুব বেশি দেখা যায়নি৷
আমরা
ক্ষুদ্র
একটি ত্রাণ দল নিয়ে জামালপুর ও গাইবান্ধা গিয়েছিলাম৷
বড়দের জন্য চাল রুটি দেবার পাশাপাশি শিশুদের
জন্য হাইপ্রোটিন বিস্কুট ও লংলাইফ দুধ দেবার ব্যবস্থা
করেছিলাম৷
কয়েকদিনের বন্যায় অভুক্ত থাকা শিশুদের
মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এই দুধ ও বিস্কুট দারূন ভূমিকা
রেখেছিল৷
সে কারনেই, শিশুদের
কথা, আরও স্পষ্ট করে বলা চলে, কন্যাশিশুদের
কথা মনে রেখে যেন আমরা বন্যা প্রতিরোধের চিন্তা করি৷
নিজেদের খাবার দাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেয়ার পাশাপশি
দুর্বিপাকে পড়া পরিবারের সদস্যদের সামান্য সঞ্চয়ও হাত
ছাড়া করে ফেলতে হয়৷
হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পানির দামে বিক্রি করে দেয়া
ছাড়াও নারীর যক্ষের
ধন গয়না আগে ভাগে বিক্রির চাপ আসে৷
এমনিতেই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতা
খুবই সামান্য৷
বিপদে পড়লে গয়না বিক্রি করে কোনো মতে তাঁদের বাঁচার
সুযোগ থাকে৷
কিন্তু সংকটের শুরুতেই
পুরুষরা যেভাবে নারীর শেষ সম্বল বিক্রি করে দেবার
জন্যে চাপ সৃষ্টি
করে তা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক৷
তাছাড়া সংকটকালে অনেক সময় গৃহিনীদের ওপর চাপ সৃষ্টি
করা হয় যে, তারা যেন তাদের পিতামাতার কাছ থেকে কিংবা
ভাইদের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য সম্পত্তির ভাগ নিয়ে আসে৷
মনে রাখা চাই, এই সম্পত্তির ভাগ কিন্তু যে কোনো নারীর
হাতের পাঁচ৷
যদি স্বামী মারা যায়, কিংবা স্বামী পরিত্যাগ করে তখন
নারীকে কপর্দকহীনভাবেই বাপের বাড়িতে আসতে হয়৷
যদি সে আগেই তার ভাগের জমি নিয়ে থাকে, তাহলে এমন
সংকটকালে তাকে দারূন উপেক্ষার
শিকার হতে হয়৷
অথচ বন্যা বা প্রাকৃতিক সংকট তেমনি এক ঝুঁকিপূর্ন
অবস্থায় নারীকে ঠেলে দেয়৷
এবারের বন্যার ফলে নিঃসন্দেহে গরীব দুঃখী মানুষের দুঃখ
কষ্ট বেড়েছে৷
কিন্তু গরীব নারীর কষ্ট অন্যদের চেয়ে আরও বেশি বেড়েছে৷
তবে যেসব গরীব নারী নিজেদেরকে গ্রুপ বা সমিতির সঙ্গে
সম্পৃক্ত করেছে তাদের অবস্থা এমনটি হয়নি৷
উল্টো সম্মিলিতভাবে তারা বন্যার মতো সংকট দূর করতে
পেরেছে৷
তাদের সঞ্চয়ের অংক থেকে তারা ঋণ নিয়েছে৷
তারা যে সংগঠনের সদস্য সেই সংগঠনের
কর্মীরাও
বন্যার্ত সদস্যদের জীবনকে ঝুঁকিমুক্ত করতে এগিয়ে এসেছে৷
এভাবে সংগঠিত নারীর জীবনচলা দুর্যোগে,
দুঃসময়ে অসংগঠিতজনদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত
নিরাপদ ছিল৷
বন্যা-উত্তর সময়েও তারা আরও ভালোভাবে বাঁচার অবলম্বন ঐ
সংগঠনের কর্মকান্ডের ভেতর খুঁজে পেয়েছেন৷
অন্যদের মতো তাঁদের গয়না-গাটি বা গরু-ছাগল বা
হাঁস-মুরগী পানির দামে বিক্রি করতে হয়নি৷
কিংবা মহাজনের কাছে অধিক সুদে দাদনও নিতে হয়নি৷
অবশ্য সংগঠিত নারীর সংখ্যা এখনও অনেক কম৷
যদিও বাংলাদেশে এনজিও ও অন্যান্য নাগরিক সংগঠনের সদস্য
সংখ্যা নেহায়েত কম নয়, তবুও বিপুল পরিমাণ দরিদ্র
মানুষের বিচারে এখনো আরও সংগঠন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে৷
তবে সরকারকে এসকল স্থানীয় সংগঠন গড়ার জন্যে সহায়ক
পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে৷
বাংলাদেশে এখন এক কোটিরও বেশি পরিবার ক্ষুদ্র
ঋণের অধীনে চলে এসেছে৷
এদের শতকরা নব্বই
ভাগই নারী৷
এই সংগঠিত নারীদের পক্ষে
যতোটা সফলতার সঙ্গে বন্যার মোকাবেলা করা সম্ভব
হয়েছে, অন্যদের পক্ষে তা
সম্ভব
হয়নি৷
তাই আরও বেশি করে নারীদের জন্য সংগঠনের সদস্য হবার
সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে দারিদ্র নিরসনের লড়াইতে আমরা
আরও সফল হবো৷
একই সঙ্গে শিক্ষা,
স্বাস্থ্য খাতে নারীর দিকে সম্পদ প্রবাহের গতি বাড়াতে
হবে৷
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারগুলোতে নারীর
প্রতিনিধিত্ব হালে বেড়েছে৷
কিন্তু তাদের হাতে সেভাবে সম্পদ দেয়া হচ্ছেনা৷
আগামীতে তাদের মাধ্যমে বাজেটের একটি অংশ খরচ করা গেলে
গ্রাম বাংলায় নারীর ক্ষমতায়নের
বলয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব
হবে৷
তবে এবিষয়টি এমনি এমনি বাস্তবায়িত হবে না৷
নাগরিক সংগঠনগুলোকে আরও সোচ্চার হতে হবে৷
মনে রাখা চাই, যে সমাজে মানুষ সংগঠিত, সে সমাজে
দুযোর্গ
এলেও সংগঠিত মানুষের পক্ষে
দুর্গতি কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়৷
সংগঠিত নারীর ক্ষেত্রে
এটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক৷