| Main Links |
| |
|
standing Committee of Forum |
| |
|
নারীর কথা-৪ |
| Main Links |
| |
|
standing Committee of Forum |
| |
|
নারীর কথা-৪ |
|
|
|
|
|
আলোকিত আরতি
কাজী ফাতেমা বর্নালী |
|
|
বিয়েবাড়ি মানেই একটু হৈচৈ, একটু আনন্দ৷ কিন্তু এত আনন্দের
মাঝেও কোথায় যেন বিষণ্নতার সুর৷ ‘বিয়ে’ মানে যদিও একটি মেয়ের
জীবনে শুভস্বপ্নের সূচনা৷ কিন্তু এই স্বপ্ন সব সময় সবার জন্য
শুভ হয় না৷ অন্তত আরতির জীবনে কথাটি খুবই সত্যি৷ বিয়ের পর
থেকেই একজন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য আরতিকে নানান
প্রতিকূলতার বাধা পার হতে হয়েছে৷ সেই আরতি রায় এখন শুধু নিজের
জন্যই না, বরং সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের নিয়ে কাজ করে যাচেছন৷
আরতির জন্ম ১৯৭২ সালের ১লা মে, বরগুনা জেলায়৷ পরিবারের চার ভাই
দুবোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম৷ ছোটবেলা থেকে বাবাকে খুব একটা কাছে
পাননি আরতি৷ কাজের কারণে বাবা থাকতেন বরিশাল৷ আরতি যখন ষষ্ঠ
শ্রেণির ছাত্রী, তখন তার বাবা মারা যান৷ সংসারে মা এবং
ভাইবোনদের সাথে দিন কাটতে থাকে আরতির৷ গ্রামে কিছু জায়গা জমি
থাকায় আরতিদের পড়াশুনা করিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাতে পারতেন
তার মা৷
নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্থানীয় কমিশনার বিশ্বনাথ ঘোষের ছেলে
শঙ্কর
ঘোষের সাথে আরতির বিয়ে হয়৷ বরপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় অমত
থাকার পরও মা ভাইরা বাধ্য হন শঙ্করের সাথে আরতির বিয়ে দিতে৷
আরতিও এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না৷ আর এই রাজি না হওয়াটাই তার
জীবনের বড় হয়ে দাঁড়ায়৷ বিয়ের পরে আরতির স্বামী জানতে পারেন,
বিয়ের আগে আরতি লোকজনকে বলেছেন, তিনি গুণ্ডা ছেলেকে বিয়ে করবে
না৷ এই কথার জের ধরে প্রতিদিন মার খেতে হতো তাকে৷ শুধু তাই নয়,
একান্নবর্তী পরিবার হওয়ার কারণে স্বামীর নির্যাতনের পাশাপাশি
শ্বশুরবাড়ির অন্য সদস্যদের হাতেও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হতো৷
বিয়ের এই তিন বছরের মধ্যে বাবাবাড়ির সাথে কোনো যোগাযোগ করতে
দেওয়া হয়নি তাকে৷ মাঝে মাঝে মায়ের পাঠানো গোপন চিঠিগুলোই ছিল
তার একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম৷
এ রকমই এক চিঠিতে একবার আরতির মা আরতিকে আবার লেখাপড়া শুরুর
পরামর্শ দেন৷ মা’র সেদিনের সেই পরামর্শ আরতিকে ভীষণভাবে
উৎসাহিত করে৷ কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, অবস্থা বদলাতে হলে
স্বামীর সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, বরং তার সহযোগিতা নিয়েই করতে হবে৷
তারপর স্বামীকে একদিন লেখাপড়ার কথা বলতেই আরেক দফা গালমন্দ
শুনতে হয় তাকে৷ এরপর অনেক কষ্টে তিনি তার স্বামীকে রাজি করান৷
কিন্তু কীভাবে পড়বেন? বইখাতা কোথায় পাবেন?
অবশেষে অনেক কষ্টে বইপত্র যোগাড় হয় তার৷ কিন্তু পড়ার সময় খুব
সতর্ক থাকতে হতো আরতিকে৷ কেউ যেন জানতে না পারে, কেউ যেন
বিরক্ত না হয়, তার জন্য কতই না চেষ্টা! তাই হারিকেনের চারপাশ
কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে, মনে মনে পড়তে হতো তাকে৷ এভাবেই চলতে থাকে
আরতির পড়াশুনা৷ তারপর মা ও প্রতিবেশী সাংবাদিক স্বপন দাসের
সহযোগিতায় এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেন তিনি৷ আর এভাবেই ১৯৮৯
সালে এসএসসি পাশ করেন৷ পরীক্ষা দেওয়ার কিছু দিন পর আরতির একটি
পুত্র সন্তান হয়৷ বাড়িতে আনন্দের স্রোত বয়ে যায় তার সন্তান
তুষারকে ঘিরে৷ আর সন্তান হওয়ায় কিছুটা যেন স্বস্তি পান আরতি৷
শ্বশুরবাড়ির লোকজনও বংশের একজন উত্তরাধিকারী পেয়ে খুব খুশি৷ এই
সুযোগে আরতি তার বাবার বাড়ির সাথে দূরত্ব কমাতে থাকেন এবং
শ্বশুরবাড়ির লোকজনও অনুমতি দেয় সেখানে আসা যাওয়া করার৷ সবার
আদরে মানুষ হতে থাকে একমাত্র সন্তান তুষার৷ ছেলেকে লালনপালন করা
ও এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার চিন্তায় সময় কাটতে থাকে আরতির৷ তার
স্বপ্ন, লেখাপড়া শেষ করবেন তিনি৷ শুধু চিন্তা কীভাবে পরীক্ষা
দেবেন! এ সময় একদিন আরতি জানতে পারেন প্রাইভেট পরীক্ষার কথা৷
কিন্তু ভয়ে পরীক্ষা দেওয়ার কথাও কাউকে বলতে সাহস পান না৷ তারপর
একটু সামলে উঠে আবার আগের মতো শুরু করেন লেখাপড়া৷ তিন বছর পর
একইভাবে পরীক্ষা দিয়ে ১৯৯২ সালে এইচএসসি পাশ করেন৷
এরপর থেকে আরতি তার ভেতরে এক ধরনের শক্তি অনুভব করেন৷ এখন আর
তিনি দুর্বল নন, নিজের ভিত শক্ত মনে হয় তার৷ এই সময়ই বাড়িতে
চলছিলো তার ছোট ননদের বিয়ের প্রস্তুতি৷ বিয়েতে শ্বশুড়বাড়ির কেউ
তাকে গুরুত্ব দেয় না৷ কিন্তু একজন মেয়ে হিসেবে আরতি বুঝতে
পারেন, বিয়ে মানে অনেক খরচের ব্যাপার৷ আর সংসারের একজন সদস্য
হিসেবে তারও যে দায়িত্ব আছে, সেটা তিনি অনুভব করেন৷ আর মনে
করেন, আমার ননদ না হয়ে যদি সে আমার ছোট বোন হতো! তাই আরতি
বাবার বাড়ি থেকে ২৫ হাজার টাকা যোগাড় করে তার শ্বশুরবাড়িতে দেন৷
ননদের বিয়েতে তার সাহায্যের ব্যাপারটি শ্বশুরবাড়ির লোকের চোখে
পড়ে৷ তারা খুশিও হয়৷ আর এতে করে শ্বশুড়বাড়িতে তার গ্রহণযোগ্যতা
বেড়ে যায়৷ এই সময়ই আরতি প্রস্তুতি নিচিছলেন বিএ পরীক্ষা দেওয়ার৷
এবার অবশ্য তার স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি বাধ সাধেনি৷ এরপর তিনি
সাফল্যের সাথেই বিএ পাশ করেন৷
এবার আরতি ভাবেন, ‘বিএ পাশ যখন করেছি, বসে না থেকে একটা চাকরি
করি৷ এত কষ্টে অর্জিত শিক্ষাকে কাজে লাগাই৷’ কিন্তু চাকরি করার
কথা শুনলে তার স্বামী বা পরিবারের কেউ রাজি হয় না৷ আগের মতো
শক্তভাবে বাধা না দিলেও সম্মতিও দেয় না কেউ৷ তা সত্ত্বেও ১৯৯৫
সালে পাথরঘাটা থানায় ‘আশা’ সংগঠনে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি
সুপারভাইজার পদে যোগদান করেন আরতি৷ সেই থেকে তার কর্মজীবন শুরু৷
তারপর ১৯৯৮ সালে নিজের গড়া ‘জাগো নারী’ সংস্থায় কাজ করেন৷
এছাড়াও বরগুনার লোকাল এনজিও সংগ্রাম, কেয়ার বাংলাদেশ-এ কাজ
করেছেন৷ বর্তমানে আরতি জিওবি ডানিডাতে কাজ করছেন৷ এই কাজগুলো
করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে তাকে৷ যেমন:
স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, জেন্ডার ও হিসাব,
ওয়াটার সাপ্লাই এন্ড স্যানিটেশন, পিআরএ মনিটরিং, টোটাল
স্যানিটেশন, রিফ্লেক্ট প্রশিক্ষণ, আইজিএ এবং নিড এ্যাসেসমেন্ট,
অংশগ্রহণমূলক মনিটরিং এবং মূল্যায়ন, সিডও সনদ, নারী নেতৃত্ব
বিকাশ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ইত্যাদি৷ এছাড়া তিনি কম্পিউটার ও সেলাই
প্রশিক্ষণও নিয়েছেন৷
আরতি এখন কাজ করে যাচেছন তৃণমূলের হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষের
জন্য৷ আর কাজ করতে গিয়ে, দেশের মানুষের এত কষ্ট দেখে নিজের
দুঃখ-কষ্ট তার কাছে আর বড় মনে হয় না৷ বরং তার কেবল মনে হয়, এই
অসহায় মানুষগুলোর জন্য সামান্য কিছুও যদি করতে পারি! তৃণমূলের
মানুষের সাথে যে বিষয়গুলো নিয়ে তিনি কাজ করছেন, তা হলো-
স্যানিটেশন, হাইজিন প্রমোশন, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধ, নারী
নির্যাতন প্রতিরাধ, আইজিএ প্রশিক্ষণ দেওয়া, ঝরে পড়া শিশুদের
শিক্ষা দেওয়া, ইমাম সেশন, তরুণীদের উত্ত্যক্ত করা প্রতিরোধ টি
স্টল এবং কমিউনিটি মিটিং, ইউনিয়ন ওয়াটসান মিটিং, নিরাপদ পানির
ব্যাবহার, স্বাস্থ্য-সম্মত পায়খানা তৈরি ইত্যাদি৷ এছাড়াও
সামাজিক কার্যক্রমগুলোতেও সহায়তা প্রদান ও বিভিন্ন দিবসগুলোতের্
যালি, আলোচনা ও সামাজিক বিচার সালিশ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধসহ
বিভিন্ন কাজে অবদান রেখে যাচেছন প্রতিনিয়ত৷
এভাবে সামাজিক কাজগুলো করতে করতে একদিন এলাকার স্থানীয়
উজ্জীবকদের কাছে ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’ ও ‘বিকশিত নারী
নেটওয়ার্ক’- এ উজ্জীবক ও নারীনেত্রী প্রশিক্ষণের কথা শোনেন৷
কথাগুলো শুনতে শুনতে তার মনে হচিছল মানুষের বিকাশের জন্য এই
প্রশিক্ষণ নেওয়া দরকার৷ এরপর তিনি ২০০৭ সালে বরিশালে ‘বিকশিত
নারী নেটওয়ার্ক’- এ ১২তম ব্যাচে ৩ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷
প্রশিক্ষণ থেকে তার চিন্তা-চেতনার বহু অজানা দিক উম্মোচিত হয়
এবং জেন্ডার, নারী পুরুষের বৈষম্য ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা
পান তিনি৷ প্রশিক্ষণের পর তার ভয় কেটে যায়৷ আগে তিনি কোনো কাজ
করতে গেলে কোনো না কোনোভাবে পুরুষের দরকার৷ কিন্তু প্রশিক্ষণে
তার বিশ্বাস জমেছে নারীরা সব কিছু করতে পারে৷
প্রশিক্ষণের পরই আরতি একটি সংগঠন তৈরি করেন ২০০৭ সালের জুলাই
মাসে৷ সংগঠনের নাম দেন ‘মাতৃমঙ্গল মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’৷ এই
সংগঠনের মাধ্যমেই এখন তিনি তার এলাকায় উন্নয়নের কাজ করে যাচেছন৷
এই কাজগুলোর মধ্যে আছে, বিভ্ন্নি বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে নিয়মিত
উঠান-বৈঠক ও আলোচনা সভার আয়োজন, নারীর উন্নয়নভিত্তিক বিভিন্ন
বই একত্রে পড়া, বিভিন্ন দিবস উদ্যাপন ইত্যাদি৷ শুধু তাই নয়,
আরতি স্থানীয় মানুষকে সচেতন করার জন্য বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক
নাটকেরও আয়োজন করে থাকে৷ বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতন,
ইভটিজিং ও জন্মনিবন্ধনের উপর নাটক করেছে তারা৷ আরতির ভাষায়,
‘নাটকের মাধ্যমে সহজে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়৷’ পত্তাখালি
গ্রামের নাসিমা ও পৌরসভার সোনিয়ার মাত্র বারো বছর বয়সে বিয়ে
দিয়ে দেয়া হচিছলো৷ আরতির চেষ্টাতেই বন্ধ হয়েছে এ দু’টি
বাল্যবিবাহ৷ পাশাপাশি এ বিষয়ে সচেতনতাও তৈরি করে যাচেছন তিনি৷
বরগুনার আরতী রায়৷ এক সফল মানুষের নাম৷ হাজারো কষ্টের মধ্যে
ক্রমাগত প্রচেষ্টার ফলে তার এই সফলতা৷ এখন আরতি নিজের
পরিশ্রমের টাকা দিয়ে শ্বশুরের ভিটেতে ঘর তুলেছেন৷ শুধু তাই নয়
নিজের পরিবারকেও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে দু’পরিবারের
কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছেন তিনি৷ পাশাপাশি পড়াশোনাটাও চালিয়ে
যাচেছন তিনি৷ হোমিওপ্যাথিক প্যারামেডিক্যালে পড়ছেন আর এলএলবিতে
ভর্তি হয়েছেন৷ সামনে ফাইনাল পরীক্ষা আরতির৷ এত কাজের পাশাপাশি
চলছে পরীক্ষার প্রস্তুতিও৷ প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে
যাচেছন আরতি রায়৷ সংগ্রামী এই নারী এখন স্বপ্ন দেখেন সমৃদ্ধ এক
বাংলাদেশের৷ তার বিশ্বাস, বাংলাদেশের প্রতিটি নারীর সংগ্রামী
মনোভাব থাকলে কোনো বাধা আর তাদের আটকাতে পারবে না ৷ |
|
|
|
|
|
National
Girl Child Advocacy Forum |
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |
|