|
|
প্রায়ই পত্রপত্রিকায় আমরা দেখছি যে বখাটে যুবকদের উৎপাতে মেয়েরা
রাস্তাঘাটে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে না৷ আমাদের দেশে
প্রতিদিন কতো মেয়ে এভাবে রাস্তাঘাটে উত্ত্যক্ত ও হয়রানির শিকার
হচেছ তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও এটা বলা যায়
যে, এ ধরনের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে৷ ফলে নারী, বিশেষ করে
কন্যাশিশুদের অনেকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে লেখাপড়া ছেড়ে ঘরবন্দি
জীবনযাপনে বাধ্য হচেছ৷ অনেকের অল্পবয়সে বিয়ে হয়ে যাচেছ৷ এই ইভ
টিজিং-এর প্রকোপ বর্তমানে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যে খিলগাঁওয়ের
সিমি, মিরপুরের ফাহিমা, খুলনার রুমি, গাইবান্ধার তৃষা, স্বপ্না,
সাভারের তিথির মতো অসংখ্য কিশোরী নিজের জীবনের সমাপ্তি টেনেছে
আত্মহননের মধ্য দিয়ে৷ উত্ত্যক্ততা ও হয়রানির ঘটনায় বাংলাদেশে
যেভাবে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচেছ, পৃথিবীর অন্য
কোথাও সেরকম নেই৷ অবশ্য অন্যান্য দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আইনি
প্রতিকার পাওয়া যায়৷ আর আমাদের দেশে আইনি প্রতিকার তো দূরের কথা,
এরকম ঘটনায় পরিবার ও সমাজের মানসিক সমর্থনও অনেক সময় পাওয়া যায়
না৷ গাইবান্ধার শিশু তৃষা কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা
বিভাগের ছাত্রী সিমি আত্মহননের পথ বেছে নেয়ার পর দেশব্যাপী
অনেক হৈচৈ হয়েছে৷ নারী আন্দোলনের কর্মীরা বিষয়টি নিয়ে
ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামও গড়ে তুলেছিল৷ কিন্তু এ পর্যন্তই৷
ইভটিজিং তাতে কমেনি৷
ইভটিজিং কেন হচেছ
যৌন হেনস্থা পাশ্চাত্য দেশগুলির থেকে ভারতবর্ষে বিশেষত আমাদের
এই বাংলাদেশে অনেক বেশি ঘটে৷ যদিও এ ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কোনো
তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি৷ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েরা পুলিশের
কাছে গিয়ে যৌন হেনস্থার কথা রিপোর্ট করেন না৷ মারাত্মকভাবে আহত
না হলে, পুলিশ এ ব্যাপারে শুধু ডায়েরি নেয়া ছাড়া আর বিশেষ কিছু
করে না বলে বহু অভিযোগ শোনা যায়৷ এফআইআর নেওয়ার ব্যাপারে
পুলিশের যে অনীহা আছে, তা পত্র পত্রিকায় ও নানা রিপোর্টে
উল্লেখিত হয়েছে৷ বরং পুলিশ এ ব্যাপারে নারীাদের আইনের সাহায্য
না নিতেই উপদেশ দিয়ে থাকে৷
নারীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই মূলত উত্ত্যক্ততা ও
হয়রানির সূত্রপাত ঘটে৷ পুরুষতান্ত্রিক মন-মানসিকতায় পুষ্ট সমাজ
ভাবে নারীরা সব সময় পুরুষের অধস্তন, তাই তাদের সঙ্গে ইচছামতো
ব্যবহার করা যায়৷ তাদেরকে শুধু ভোগ্য বা পণ্য হিসেবে দেখার
প্রবণতা বাড়ছে৷ বিশেষ করে গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপন, মিউজিক ভিডিও,
সিনেমা ইত্যাদিতে নারীর উপস্থিতি এখন অনেকটাই যৌন বস্তু (ংবী
ড়নলবপঃ) হিসেবে৷ নাটক-সিনেমা-উপন্যাসে ইভটিজিং-এর মাধ্যমে
নায়ক-নায়িকার প্রেমের সূত্রপাত দেখতে দেখতে উঠতি তরুণরা
নিজেরাও উক্ত্যত্ততাকে গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেয়৷ বিবিধ কারণে আজ
যুবসমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ও ঘটছে৷ তারই বহিঃপ্রকাশ
ঘটছে যৌন হয়রানি, নারী নির্যাতন বা লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে৷
ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক অস্থিরতা
প্রভৃতিও এই অপরাধের পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে৷
উত্ত্যক্ত ও হয়রানির পথ ধরে অপহরণ, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ,
জোরপূর্বক বিয়ে, আত্মহত্যা, পরিবারের এলাকা ত্যাগ, মা-বাবা-ভাইয়ের
হতাহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে থাকে৷ এর নেতিবাচক প্রভাবও ব্যক্তি,
পরিবার ও সমাজসহ বিভিন্ন পর্যায়েই পড়ে৷ কিন্তু আমাদের
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কখনো কখনো একে একটি রোমান্টিক
ইমেজ দিতে চায় এবং টিজিংকারী পুরুষদের ‘রোমিও’ বলে অভিহিত করা
হয়৷ রোমান্টিকতার আড়ালে ইভটিজিং-এর কুফল বা নেতিবাচক পরিণতিগুলো
তাই আমাদের চোখে পড়ে না৷
কেন আমাদের দেশে যৌন হেনস্থা এত বেশি, এ বিষয়ে গবেষণা হওয়া
উচিত৷ গবেষকের মতে, এ ব্যাপারে স্যাটেলাইট চ্যানেল, টিভি নাটক,
বিজ্ঞাপন এবং হিন্দি সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ প্রভার রয়েছে৷ এছাড়া
এর জন্য সমাজে বিদ্যমান নারী পুরুষ বৈষম্য এবং মূল্যবোধ ও
নৈতিকতার অভাব দায়ী৷ কিছু গবেষক অবশ্য বিশ্বাস করেন, যেসব
মেয়েরা অন্তঃপুর থেকে বাইরের জগতে পড়াশুনা বা কাজ করতে বের
হচেছন তাদের অবদমন করাই এ ধরনের যৌন হেনস্থার মুখ্য উদ্দেশ্য৷
ইভ টিজিংয়ের বিভিন্ন ধরন বা রূপ
ইভটিজিং আগে কেবলমাত্র কথা বা শিস দিয়ে মেয়েদের উত্যক্ত করার
মধ্যে থাকলেও, বর্তমানে ইভটিজিংয়ের ধরনও বদলাচেছ এবং এতে নতুন
নতুন মাত্রা যোগ হচেছ৷ এখন গ্রামে-গঞ্জে মেয়েরা নিরাপদে স্কুল
কলেজে যেতে পারে না৷ অভিভাবকরা আতংকে থাকেন৷ স্কুল বা কলেজের
যাত্রাপথে বখাটেরা রাস্তার ধারে দলবেঁধে থাকে এবং মেয়েদের
যাত্রাপথে অশ্লীল মন্তব্য, বাজে অঙ্গভঙ্গি করে থাকে এবং উঠিয়ে
নিয়ে যাওয়ার জন্য ভয়-ভীতি দেখায়৷ এছাড়া বখাটেরা অজ্ঞাত পরিচয়ে
মোবাইল ফোনে উক্ত্যক্ত করে৷ এছাড়া এরা মোবাইল ফোনের নম্বর
সংগ্রহ করে হুমকির পাশাপাশি অশ্লীল ম্যাসেজ পাঠায়৷
আগে পাড়া বা মহল্লার ছেলেরাও নিজ পাড়ার মেয়েদের অন্য পাড়ার
ছেলেরা এসে টিজ করলে তাকে তারা রক্ষা করতো৷ ফলে ঐ পাড়ায় মেয়েরা
নিরাপদে চলাফেরা করতে পারতো৷ এখন মানুষের সাথে পারস্পরিক
সম্পর্কে ভাটা পড়ায় কেউ আর সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে না,
পাছে উল্টো ফল হয় এই ভেবে৷
কেউ কেউ উঠতি বয়সী তরুণ বা আরো একটু বয়সীদের এরূপ আচরণকে
‘তারুণ্যের উচছ্বাস’ বলেন৷ কিন্তু কোনো চল্লিশোধর্ব ভদ্রলোকের
এরূপ আচরণকে কিসের উচছ্বাস বলবেন? আমরা কি ধরে নিতে পারি না
যে, এরূপ সকল আচরণই অযাচিত? মেয়েদের প্রতি এমন আচরণ যারা করে
তাদের সামগ্রিক গতিবিধিই স্পষ্ট করে দেয়, যে তারা কোনো সৎ
উদ্দেশ্য থেকে এটা করছে না৷ অনেক বয়স্ক লোক আছেন যারা কোনো
জনবহুল জায়গাতে (হাসপাতাল, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন) মেয়েদের
দেখলে অযাচিতভাবে আলাপ জমিয়ে দেন৷ এই মুখোশধারীরা অভিভাবকত্বের
অধিকার দেখিয়ে মেয়েদের হয়রানি করে৷ এরকম আরও অনেক পন্থা প্রয়োগ
করে উত্ত্যক্ত করা হয় মেয়েদেরকে৷
ইভটিজিং না যৌন হেনস্থা?
টিজিং এর আভিধানিক অর্থ পরিহাস, জ্বালাতন ইত্যাদি৷ তাই ইভটিজিং
শুনলে মনে হয়, সেটা দুষ্টুমি হতে পারে কিন্তু সে রকম অন্যায় নয়৷
পাশ্চাত্য দেশে অবশ্য এই শব্দটা ব্যবহার করা হয় না৷ এই আচরণ
যৌন হেনস্থার (ংবীঁধষ যধৎধংংসবহঃ) আওতায় পড়ে৷
অনেকের মতে, ইভটিজিং শুধু অশ্লীল কথা বা অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে
মেয়েদের বিরক্ত করা, অন্যপক্ষে যৌন হেনস্থার সাথে দৈহিক জোরজবর
দস্তি ও শ্লীলতাহানি যুক্ত থাকে৷ এইভাবে দুটির পার্থক্য করা
দুরূহ৷ আবার কেউ কেউ যৌন হয়রানি ও ইভটিজিং এর মধ্যে কোনো
পার্থক্য দেখেন না৷ শুধু ‘ইভ টিজিং’ কথাটা ব্যবহার করেন যখন
যৌন হেনস্থা রাস্তায় ঘটে কিংবা যেখানে জনগণের চলাচল আছে, যেমন
বাস, পার্ক বা সিনেমা হলে৷ আর ‘যৌন হেনস্থা’ শব্দটা ব্যবহার
করেন যখন ঘটনাটি ঘটছে অফিসে বা চার দেয়ালের অন্তরালে৷
ইভ টিজিং : দায়ী আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি
আসলে ইভটিজিংয়ের শিকড় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা মূল্যবোধের মধ্যেই
মিশে রয়েছে৷ নারীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ ও সহিংস সংস্কৃতির
পরিবর্তন ঘটিয়ে নারী-পুরুষের অংশীদারিত্বমূলক, সহমর্মিতাপূর্ণ,
দায়িত্বশীল, সুস্থ সম্পর্কের বিকাশের প্রতি মনোযোগ দেয়া দরকার৷
এ ব্যাপারে পরিবার থেকেই উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে, পরিবর্তন
করতে হবে নেতিবাচক মানসিকতা৷ শিশুর বেড়ে ওঠা ও সামাজিকীকরণের
মধ্যেই নারীর প্রতি এই বিদ্বেষ ও সহিংস মনোভাব আত্মস্থ হয়ে পড়ে
এবং তা ছেলে শিশুর ব্যক্তিত্বের অংশে পরিণত হয়৷ পরিণত জীবনে
যাকে মুছে ফেলা কঠিন হয়৷ তাদের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে যাতে তারা
মেয়েদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদার মনোভাব নিয়ে বেড়ে ওঠে৷
ক্ষমতাবান পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নির্মিত সামাজিক
দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এই আচরণকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না৷
কখনো তা তারুণ্যের উচছ্বাস, কখনো বা দুরভিসন্ধিমূলক হতে পারে৷
এই বিরক্তিকর আচরণ সম্পর্কে মেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমাজ
মূল্যায়ন করে না৷ বরং উল্টোভাবে দেখবে৷ মেয়েটাই অনেকটা এ
ব্যাপারে প্রলুব্ধ করেছে৷
ইভটিজিং-এর মতো মেয়েদের প্রাণসংহারক একটি গুরুতর অপরাধকে
হাল্কাভাবে দেখার এবং এর দোষ মেয়েদের ঘাঁড়ে চাপানোর প্রবণতাই
এর ব্যাপ্তি বাড়াতে সহায়তা করছে৷ আমাদের রক্ষণশীল সমাজের ধারণা,
মেয়েদের জায়গা ঘরে আর ছেলেদের জায়গা ঘরের বাইরে৷ পরোক্ষভাবে
তারা ইভটিজিং এর জন্য মেয়েদের পোশাক পরিচছদের অশালীনতাকেই দায়ী
করে৷ এমনও বলা হয়ে থাকে যে মেয়েরা ‘অশালীন পোশাক’ পরে
রাস্তাঘাটে চলাচল করে বলেই হয়রানির ঘটনা ঘটে৷ হয়রানিকারীদের
দায়ী না করে সমাজ উল্টো মেয়েদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তাদেরকে
মানসিকভাবে আরো বিপর্যস্ত করে তোলে৷ অন্যদিকে অপরাধীরা দ্বিগুণ
উৎসাহে এ কাজ চালিয়ে যায়৷ সমাজের চাপ এবং নিরুৎসাহতার কারণে এ
ব্যাপারে আইনের দ্বারস্থ হতেও সমস্যা হয়৷
আইনের স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই
আমাদের দেশে ইভটিজিংয়ের ঘটনা থেকে আত্মহত্যার ঘটনা আশংকাজনক
হারে বাড়ছে৷ দেশের প্রচলিত যেসব আইনে ইভটিজিং জাতীয়
কর্মকাণ্ডের বিচার সম্ভব সেগুলো হলো: দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ২৯৪
এবং ৫০৯), ঢাকা মহানগরী পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (ধারা ৭৬)৷
দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কেউ কোনো নারীর শালীনতার
অমর্যাদা করার জন্য কোনো মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি বা কোনো বস্তু
প্রদর্শন করে তাহলে ওই ব্যক্তি এক বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডে
দণ্ডিত হবে৷ দণ্ডবিধি আইনের ২৯৪ ধারায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি
অন্যদের বিরক্তি সৃষ্টি করে কোনো প্রকাশ্য স্থানে কোনো অশ্লীল
কাজ করে বা কোনো প্রকাশ্য স্থানে বা তন্নিকটে কোনো অশ্লীল গান,
গাঁথা বা পদাবলী গায়, আবৃত্তি বা উচচারণ করে তাহলে উক্ত
ব্যক্তির উক্ত কাজকে অপরাধ হিসেবে ধরা হবে এবং উক্ত ব্যক্তি
সর্বোচচ ৩ মাস পর্যন্ত মেয়াদের কারাদ সঙ্গে জরিমানা বা উভয়
দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে৷ অন্যদিকে মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রচলিত
পুলিশ অধ্যাদেশের ৭৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ কোন রাস্তায় বা
সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে বা সেখান হতে দৃষ্টিগোচরে স্বেচছায়
এবং অশালীনভাবে নিজ দেহ এমনভাবে প্রদর্শন করে যা কোনো গৃহ বা
দালানের ভিতর থেকে হোক বা না হোক, কোনো মহিলা দেখতে পায় বা
স্বেচছায় কোনো রাস্তায় বা সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে কোনো
মহিলাকে পীড়ন করে বা তার পথরোধ করে, বা কোনো রাস্তায় বা
সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে অশালীন ভাষা ব্যবহার করে, বা অশ্লীল
আওয়াজ, অঙ্গভঙ্গি বা মন্তব্য করে কোনো মহিলাকে অপমান বা বিরক্ত
করে তবে সেই ব্যক্তি এক বৎসর পর্যন্ত মেয়াদের কারাদণ্ডে অথবা
দুই হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা দণ্ড বা উভয় প্রকার দণ্ডে
দণ্ডনীয় হবে৷
এছাড়া একই অধ্যাদেশের ৭৫ ধারায় সর্বসমাজে অশালীন বা উচছৃঙখল
আচরণের শাস্তি হিসেবে তিন মাস মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ডের বা
পাঁচশত টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবে বলে বলা হয়েছে৷
কিন্তু এসব অপরাধের সাক্ষ্য প্রমাণের দায়িত্ব নিতে হয়
অভিযোগকারীকেই, যা একটি দুরূহ বিষয়৷ তাই আইনগুলো মেয়েদের
উত্ত্যক্ততা প্রতিরোধে কার্যকরী নয়৷ এগুলোতে নারীদের উত্ত্যক্ত
করার জন্য শাস্তির বিধান আছে সর্বোচচ মাত্র তিন মাস বা এক বছর
কারাদণ্ড কিংবা দু’হাজার টাকা জরিমানা৷ জরিমানা আদায় না হলে কী
করা হবে তার উল্লেখ নেই কোথাও৷ এই ন্যূনতম শাস্তির বিধান দিয়ে
এ ধরনের অপরাধের প্রতিকার কতোটা সম্ভব তা প্রশ্নসাপেক্ষ৷ তাছাড়া
এই আইনগুলোর কথা সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক, খোদ আইন-শৃঙখলা
রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বা আইনজীবীরাও অনেকে জানেন না৷
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এ ইভটিজিং-কে যৌন হয়রানির
একটি ধরন হিসেবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল,
যদিও ‘ইভটিজিং’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি৷ কিন্তু ২০০৩ সালে
আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শর্তগুলোকে শিথিল করা হয়েছে৷
ফলে এর আওতায় ইভটিজিং-এর ঘটনার আইনি প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে
দাঁড়িয়েছে৷ ২০০৩ সালের সংশোধনীতে একটি নতুন উপধারা সংযুক্ত করা
হয়, যাতে কোনো নারী সম্বমহানির কারণে আত্মহত্যা করলে
আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার বিধান করা
হয়েছে৷ তবে এখানে সম্বমহানির কোনো সংজ্ঞা বা আওতা নির্দিষ্ট করে
দেওয়া হয়নি৷ এ আইনে বলা হয়েছে, যৌন কামনা চরিতার্থ করার
উদ্দেশ্যে কোনো নারী বা শিশুর শরীর স্পর্শ করলে বা শ্লীলতাহানি
করলে শাস্তির বিধান হচেছ সর্বোচচ ১০ বছরের ও সর্বনিম্ন ৩ বছরের
কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড৷ তবে স্পর্শের প্রসঙ্গ থাকায় তা হয়রানি
বা আত্মহত্যায় প্ররোচনার ভেতরে পড়ে না৷ ফলে এর আওতায়
ইভটিজিং-এর কারণে আত্মহত্যার শিকার মেয়েরা যে এ আইন হতে
প্রতিকার পাবে না তা আর বলার দাবি রাখে না৷
তাই প্রয়োজন ইভটিজিং সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইন৷
যখন প্রতি বছরই আত্মসম্মান রক্ষায় বা বিচারহীনতায় নির্যাতিতরা
আত্মহত্যায় বাধ্য হচেছ তখনো কেন আইনের ব্যাখ্যার জন্য দিনের পর
দিন অপেক্ষা করতে হচেছ? আমাদের দেশে এত বাঘা বাঘা আইনবিদ
থাকতেও আজো একটি অপরাধের যথাযথ ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়নি?
ইভটিজিংয়ের ফলে সৃষ্ট সামাজিক সমস্যা
জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী নারীর ওপর যে কোনো ধরনের দৈহিক, জেবিক
ও মানসিক ক্ষতিসাধন করা বা করার চেষ্টা করা নারী নির্যাতনের
অন্তর্ভুক্ত৷ যা থেকে স্পষ্ট যে নারী নির্যাতন কেবল দৈহিক
নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়৷ ইভটিজিং বর্তমানে নারী
নির্যাতনের একটি নতুন হাতিয়ার হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে৷ একসময়
সমাজের বখে যাওয়া একটি ক্ষুদ্র অংশই ইভ টিজিং-এর সাথে জড়িত
থাকলেও এখন উঠতি বয়সী তরুণ, কিশোর, যুবকরা তো আছেই; মধ্য
বয়সীরাও এত অন্তর্ভুক্ত৷ এর ফলে যে ধরনের সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি
হয় সেটিও অনভিপ্রেত৷ ভয়-ভীতি পার হয়ে যখন নির্যাতিতা মেয়েটি
পরিবারে সদস্যদের কাছে ঘটনাটি খুলে বলে তখন পরিবারের
মূল্যবোধের কথা চিন্তা করে মেয়েটির জীবনের সকল আশা-আকাঙক্ষাকে
বিসর্জন দিয়ে বিয়ের মাধ্যমে তাকে ঠেলে দেয়া হয় ভিন্ন এক জগতে৷
আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক মেয়েশিশু ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও
এসএসসি পরীক্ষায় আগেই ঝরে পড়ে৷ স্কুল থেকে মেয়েশিশু
শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার অন্যতম একটি কারণ হলো বাল্যবিবাহ৷ অনেক
মেধাবী শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়েছে শিক্ষার আলো থেকে ইভটিজিংয়ের ফলে৷
সচছল পরিবারের অভিভাবকরা সন্তানদের পড়াশুনার বিষয়টির কথা চিন্তা
করে শহরে পাঠিয়ে দেয়৷ প্রথম আলোর ২০০৬ সালের ২১ এপ্রিলের এক
প্রতিবেদনে দেখা গেছে বাজিতপুরে এসএসসি পাশ করার পর ৪০-৫০ জন
শিক্ষার্থীর উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা ভৈরবের ছাত্রীনিবাসে পাঠিয়ে
দিয়েছেন৷ কিন্তু দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জীবনের
আশা- আকাঙক্ষার যবনিকা টানতে হয়৷ অথচ এই জঘন্য অপরাধের জন্য
তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না৷ অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে
উত্ত্যক্ততাকারী এসব বখাটে ছেলেরা বেশিরভাগই সচছল পরিবারের
সন্তান৷ সমাজে তাদের ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত থাকে৷ ফলে তাদের
বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায় না৷ যদি কোনো অভিযোগ করা
হয় তাহলে ভিকটিম পরিবারকেই তার খেসারত দিতে হয়৷
ইভ টিজিং মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধ
ইভটিজিংয়ের মাধ্যমে বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ বিকৃত বিনোদন
খোঁজে৷ এর ফলে নির্যাতিতা কিশোরী বা তরুণীটি কী ধরনের মানসিক
বিপর্যয়ের মধ্যে সময় অতিবাহিত করে তা ওই পরিবারের সদস্যরাও
অনেক সময় বোঝে না৷ পরিণতি হিসাবে যা ঘটে তা খুবই অনভিপ্রেত,
অনাকাঙিক্ষত৷
আমাদের সংস্কৃতিতে নারীর সম্বম বিবেচনা করা হয় সতীত্বের দিক
বিচার করে৷ অথচ একজন নারী সমাজের কিছু বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন
মানুষ দ্বারা সম্বম হারালে তখন মেয়েটিকেই অসতী হিসাবে আখ্যায়িত
করা হয়৷ যে মেয়েটি তার সম্বমের কথা চিন্তা করে আত্মহননের পথ
বেছে নেয় তার পেছনেও এই সম্বমবোধ কাজ করে বলে সম্বমহীন অর্থহীন
জীবনের চেয়ে সে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করে৷ প্রশ্ন হলো, আমাদের
সমাজের মেয়েরা কি এভাবে বলী হয়েই চলবেন? আর আমরা একটু আহা-উহুর
মধ্য দিয়েই আমাদের যাবতীয় দায়িত্ব শেষ করবো? সভ্যতার বড়াই করবো?
চাই সামাজিক প্রতিরোধ
ইভটিজিংয়ের ফলে আমাদের সার্বিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক
প্রভাব পড়ছে৷ অপরিমেয় ক্ষতি হচেছ৷ ইভটিজিং-এর কারণে মেয়েরা
স্বাভাবিক সব সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনা জলাঞ্জলি দিয়ে প্রথাগত
গৃহবধূর ভূমিকায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়৷ ফলে সামগ্রিক উন্নয়ন
প্রক্রিয়ায় এর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে৷ সব মিলিয়ে
আপাতদৃষ্টিতে কম ক্ষতিকর মনে হওয়া এই ঘটনাটির জন্য জাতিকে অনেক
বড় মূল্য দিতে হয়৷ তাই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাববার সময় এসেছে৷
মেয়ের পাশাপাশি একটি ছেলের মানসিক দিকটিও ভাবতে হবে৷ মেয়েদের
বলা হয় সবকিছু মুখ বুজে সহ্য কর৷ এই সংস্কৃতি আমাদের ত্যাগ করতে
হবে৷ সকল সংগঠন, কর্মক্ষেত্রগুলোর ভিতর এসব নিয়ে আলোচনা করতে
হবে৷ যেহেতু এটা একটা সামাজিক সমস্যা তাই এতে সকলকে
সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে৷ সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবারকে দৃষ্টি
দিতে হবে এবং এ অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে হবে৷
ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে৷ নারীকে
দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের অবশ্যই
নীরবতা ভেঙে রাস্তাঘাটে উত্ত্যক্ত ও হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে৷ তা না হলে মেয়েশিশুর জীবন বিকাশের
জন্য একটি বৈষম্য-নির্যাতনমুক্ত সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব
হবে না৷
|
|