|
|
শতাব্দীর শেষ এবং চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন ছিলো বেইজিংয়ে৷ ৪র্থ
সম্মেলনে আমার কিছু উল্লেখযোগ্য স্মৃতি আপনাদের কাছে তুলে ধরছি৷
এই সম্মেলনে দুশোটি দেশের দুশোটি এনজিও এর উদ্যোগে ২৮টি ককাস
গ্রুপের মাধ্যমে ৩৬২টি বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে৷ পরে এ বিষয়ে
সকল অঞ্চলের সুপারিশ সমন্বিত করে একটি প্লাটফর্ম অব অ্যাকশন
পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়৷ সম্মেলনের অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে একটি
বিষয় ছিলো সুদানের মহিলাদের উদ্যোগে ‘প্রোটেস্ট এগেইন্স্ট
ভায়োলেন্স নেম অব দ্য কাস্টম’৷ যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৯
কোটি মহিলা ও বালিকা যে অঙ্গহানিজনিত ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার
সেই চিত্র অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে ফুটে উঠে উঠেছে৷ ভিডিও
প্রর্দশনীর মাধ্যমে দেখানো হয় কী করে বর্ষীয়ান মহিলারা মেয়েদের
হাত পা চেপে ধরে নির্মমভাবে ভগাঙ্কুর কেটে নিচেছ৷ উপস্থিত
অনেকেই ভিডিও চিত্রে এ নির্মম দৃশ্য সহ্য করতে পারেননি৷
আফ্রিকার প্রায় বিশটি দেশের মহিলারা এই নির্যাতনের শিকার৷
সাধারণত ধর্মীয়, সামাজিক, যৌতুক এবং জাতিসত্তার মধ্যে প্রচলিত
রেওয়াজ অনুযায়ী অঙ্গহানি বা খৎনার মতো এ রকম নির্মম ঘটনা ঘটানো
হয়৷ এ খৎনা করার পর সেখানে সেলাই দিয়ে দেয়া হয় এবং প্রতিবার
সন্তান জন্মের সময় সেলাই আবার খুলে ফেলা হয়৷ আবার সন্তান জন্ম
প্রক্রিয়া শেষ হলে পুনরায় সেলাই দিয়ে দেয়া হয়৷ তা না হলে
স্বামীরা স্ত্রীদের ঘরে নিতে চায় না অনেক সময়৷ এ কারণে মেয়েদের
মাসিকের পথ বন্ধ হয়ে যায়৷ আর এই সেলাই খৎনা সবই হয় অদক্ষ দাই ও
অপরিষ্কার ও ভোঁতা সরঞ্জাম দিয়ে৷ সুদানে যদিও ১৯৪৬ সালেই
মেয়েদের খৎনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু শতকরা ৯০ ভাগ মেয়ের
ক্ষেত্রে এখনও তা মানা হচেছ না৷ বিশ্ব যখন এগিয়ে যাচেছ তখনও এই
ভয়াবহ প্রথা প্রচলিত রাখার জন্য দায়ী কে- এ প্রশ্ন রেখেছেন
অনেক বক্তাই৷
তিববতের মহিলাদের টাঙ্গানো তাঁবু দেখতে গিয়ে দেখা হয়ে গেলো
ভারতীয় পুলিশ আইজি মিসেস কিরন বেদীর সঙ্গে৷ টি-শার্ট ও ফুল
প্যান্ট পরে উনি হেঁটে বেড়াচিছলেন দৃঢ়তা ও আস্থা নিয়ে৷ দেখেই
বুঝা যায়, এ মাথা কারুর কাছে নোয়াবার নয়৷ আমার পরিচিত হওয়ার
ইচেছ দেখেই হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি৷ মনে পড়লো পত্রিকায় পড়া ১৯৭৭
সালের একটি ঘটনার কথা৷ দিল্লির রাজপথে তখন উগ্র শিখদের সশস্ত্র
মিছিল৷ আতঙ্কিত গোটা শহর৷ পরিস্থিতির মুখোমুখি কিংকর্তব্যবিমূঢ়
পুলিশের মুখাপেক্ষী না হয়ে কিরণ বেদী মারমুখী শিখ সমাবেশকে
শায়েস্তা করতে লাঠি হাতে চড়াও হয়েছিলেন৷ খুব সহজেই তিনি শিখ
জটলাকে ছত্রভঙ্গ করে দেন৷ এ ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা
গান্ধী তাঁকে চায়ের নিমন্ত্রণে ডেকেছিলেন৷ দিল্লির অধিবাসীরা
তাকে ডাণ্ডা বেদী হিসেবেই চেনেন৷ সেই বিখ্যাত কিরণ বেদীর সাথে
পরিচিত হয়ে খুব ভালো লাগছিলো৷ এর আগে ‘ভায়োলেন্স এগেইন্স্ট
ওমেন ’ শীর্ষক সভায় তার বক্তব্য শুনেছিলাম৷ যেখানে তাঁর
বক্তব্যে তিনি পৃথিবী, মানুষ এবং মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে
নারীর ভূমিকা সম্পর্কে পুরুষকে নতুনভাবে ধারণা দেয়ার প্রতি
গুরুত্ব দেন এবং এনজিওর সকল কাজে পুলিশকে সঙ্গে রাখার পরামর্শও
দেন৷
বেইজিংয়ে ৪র্থ নারী সম্মেলনে যৌতুক নির্যাতন বন্ধের উপায় নিয়ে
‘ডটার অব ফায়ার’ শীর্ষক এক সভা অনুষ্ঠিত হয়৷ যার উদ্যোক্তা
ছিলেন ভারতের ভিমওকবানা, পাকিস্তানের ‘সিমোর ওমেন কালেকটিভ’ এবং
বাংলাদেশের উবিনীগ৷ এখানে যৌতুক নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশের
আনোয়ারা ও হাসিনা, পাকিস্তানের ইরুম ও নাসিম এবং ভারতের গায়ত্রী
ও নাসিমা বানুর উপর কেস স্টাডি উপস্থাপন করা হয়৷ এদের
জীবনচিত্র আসলে এসব দেশের অসংখ্য নারী নির্যাতনের কয়েকটি
প্রতিচছবি মাত্র৷ এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচচার নারী ও
মানবাধিকার আন্দোলন জোরদার করার উপায় নিয়েও সভায় আলোচনা করা হয়৷
এনজিও ফোরামের ক্রেডিট কর্নারের সভায় গ্রামীণ ব্যাংকের
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ইউনূস ভাষণে বলেছিলেন, ‘ধনীদের নয়,
দরিদ্রদের ঋণ দেয়ার জন্য বিশ্বের ব্যাংকগুলোর উচিত তাদের ঋণদান
নীতিসমূহের মৌলিক পরিবর্তন আনা৷’ উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন,
‘বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ আদায়ের বিপরীতে
আমাদের পরিশোধের হার ৯৮ শতাংশ৷ এর কারণ হলো গরীবরা অত্যন্ত
সক্রিয়, কর্মতৎপর এবং ধনীদের চেয়ে কঠোর পরিশ্রমী৷ অথচ এটি খুবই
দুঃখজনক যে উন্নয়নের জন্য শুধু নারী পুরুষের বৈষম্যই নয়,
ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যও একটি উল্লেখযোগ্য বাধা৷’
কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট, ওমেন ইন এগ্রিকালচার এবং ওমেনস ইন মিডিয়া
এই তিনটি সভার অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য দিক নিয়ে আলোচনার
পরিপ্রেক্ষিতে সম্মেলন সমাপ্ত হয়৷ ওমেনস ইন ম্যাস মিডিয়া সভায়
বক্তারা বলেন, এই পেশার শীর্ষস্থানে মহিলাদের অংশগ্রহণ খুবই কম৷
ফলে এখানে নারীর ভাবমূর্তি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যাচেছ না৷
নারীর ভাবমূর্তি তৈরি করতে নিজেকেও উপযুক্তভাবে তৈরি করতে হবে৷
সময় এসেছে অর্জনের এবং অবস্থা বুঝে পরিবর্জনের৷
সবচেয়ে বেশি মন ছুঁয়ে গেছে ওমেন ইন ব্ল্যাক সমাবেশটি৷ হাজার
হাজার নারী পুরুষ কালো পোশাক পরে হাতে মোমবাতি ও ব্যানার নিয়ে
ধীর ও মৌনভাবে এগিয়ে যাচিছলেন নারীদের উপর সমস্ত অন্যায়
অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে৷ কন্ঠে তাদের গান ুডব ংযধষষ
ড়াবৎপড়সব ংড়সব ফধু...চ৷ আর এই সমাবেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে
বাংলাদেশের উবিনীগও আছে৷ দেখলাম, মিসেস সিগমা হুদা ও ভারতীয়
পরিবেশ নেত্রী মিরা শিবাকেও৷ চতুর্থ বিশ্বনারীর এ বিশাল সমাবেশ
সত্যিই সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছে যে আমরা একদিন সব বাধা অতিক্রম
করতে পারবো, পৌঁছাতে পারব নির্দিষ্ট আলোকিত গন্তব্যে৷
বিশ্ব নারী সম্মেলনের পর চলে গেলো আরও একযুগ৷ কিন্তু আমাদের
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং আমাদের নারীদের বর্তমান অবস্থান আমাদের
আশানুরূপভাবে অনুপ্রাণিত করছে না৷ বরং কখনো কখনো কোনো কোনো
ঘটনায়, আমরা পেছনের দিকে চলে যাচিছ কি-না ভেবে আতঙ্কিত হচিছ৷
নারীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা তীব্র রূপ নিয়েছে৷ এসব
নির্যাতন বন্ধ করার জন্য আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে রাষ্ট্র নীরব
ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে৷ পৃথিবীজুড়ে তাই চলছে ঝঃধঃব ারড়ষবহপব
ধমধরহংঃ ড়িসবহ৷ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে চলা আইনে নারীর
সমতা বাধাগ্রস্ত হচেছ৷ এর বিরুদ্ধে প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই সোচচার
হতে হবে৷ তবে এর মধ্যে বাংলাদেশে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে
সম্পত্তির উত্তরাধিকার হিসেবে মহিলাদের সমানাধিকারের ব্যাপারটি
চূড়ান্ত হওয়া একান্ত প্রয়োজন৷ এনজিও ফোরামের প্রতিনিধিদের এখন
গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো এই প্ল্যাটফর্ম অব অ্যাকশন
চূড়ান্তকরণের জন্য সরকারের সাথে অনবরত লবিং করা এবং
বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া৷ এখন আর কালক্ষেপণ না করে
নারীর সমতা, উন্নয়ন ও শান্তির ক্ষেত্রে বাধাগুলোকে চিহ্নিত করে
বেইজিংয়ে ১২টি সুপারিশের আলোকে লক্ষ্য, পরিকল্পনা ও তার যথাযথ
প্রয়োগ করতে হবে৷ দারিদ্র্য, শিক্ষা ব্যবস্থা, নারী নির্যাতন,
অর্থনীতি সমতায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী, নারীর জন্য
প্রাতিষ্ঠানিক কর্মপদ্ধতি, নারীর মানবাধিকার ও মেয়ে শিশুর
বঞ্চনা ও অবহেলা রোধে কার্যকর ভূমিকা নিতে না পারলে সমস্ত
প্রগতি ও অগ্রগতির পথ স্তব্ধ হয়ে যাবে৷ আর সেখান থেকে বের হয়ে
আধুনিক সমাজ বিনির্মাণ করা, সুদূর স্বপ্ন হয়েই থাকবে৷
|
|