|
|
নিরলস প্রচেষ্টা আর বিরামহীন
পরিশ্রম নাসিমা ইয়াসমীনকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে৷ তিনি
শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবেন না, নিজের এলাকার মানুষগুলোকে
আত্মনির্ভরশীল করার জন্য তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচেছন৷
এলাকার মানুষকে উজ্জীবিত করার জন্য তার প্রচেষ্টা আমাদের
অনেকের জন্যই প্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে৷
মুন্সীগঞ্জ সদরের রামপাল ইউনিয়নের সিপাহীপাড়ায় ১৯৬৮ সালে নাসিমা
ইয়াসমীন এক সম্বান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন৷ মরহুম আবু ছ্্ইাদ
চৌধুরী ও মাতা মরহুমা আকলিমা বেগমের পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের
মধ্যে নাসিমা ইয়াসমীন পঞ্চম৷ ১৯৮৪ সালে রামপাল এনবিএম উচচ
বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পাশ করেন৷ রামপাল মহাবিদ্যালয় থেকে
তিনি ১৯৮৬ সালে এইচএসসি পাশ করেন৷ শ্রীনগর সরকারি কলেজ থেকে
নাসিমা ইয়াসমীন ১৯৮৮ সালে বিএ পাশ করেন৷ সে সময়ে সিপাহীপাড়া
গ্রামে তিনিই প্রথম বিএ পাস একমাত্র নারী ছিলেন৷
শ্রীনগর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ২০০৬ সালে নাসিমা ইয়াসমীন ৯৫০তম
উজ্জীবক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷ ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি
‘নারী নেতৃত্বের বিকাশ’ শীর্ষক ফাউন্ডেশন কোর্সে অংশগ্রহণ করেন
এবং ১৩তম স্বেচছাব্রতী প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷ ২০০৮
সালের মার্চ মাসে নাসিমা ইয়াসমীনের নেতৃত্বে জাতীয় কন্যাশিশু
এডভোকেসি ফোরাম মুন্সীগঞ্জ জেলা কমিটি গঠন করা হয়৷ তিনি
ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন৷ মীরকাদিম পৌরসভা, রামপাল
ইউনিয়ন, মহাকালী ইউনিয়ন, মুন্সীগঞ্জ সদরসহ সমগ্র এলাকায় তার
নেতৃত্বে কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সদস্যরা বাল্যবিবাহ বন্ধ
এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় তৎপর হয়ে ওঠে৷ ২০০৮ সালে নাসিমা
ইয়াসমীনের নেতৃত্বে মুন্সীগঞ্জ জেলা সদর, রামপাল, মিরকাদিম,
রিকাবীবাজার, পঞ্চসার, মুক্তারপুরসহ প্রায় ৭টি স্থানে জাতীয়
কন্যাশিশু দিবস উদযাপিত হয় এবং উল্লিখিত স্থানগুলোতে
আন্তর্জাতিক নারী দিবসও পালিত হয়৷
মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রিকাবী বাজারের বিশিষ্ট সমাজকর্মী,
সংগঠক মাসুদ ফকরী খোকনের সাথে ২৪ বছর বয়সে নাসিমা ইয়াসমীনের
বিয়ে হয়৷ বিয়ের পর ১৯৯১ সালে তিনি জাতীয় যুব উন্নয়ন থেকে সেলাই
প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷ এরপর ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত
সময়ে তিনি রিকাবীবাজার ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে পাঁচশত মহিলাকে
সেলাই প্রশিক্ষণ দেন৷ ১৯৯২ সালে নাসিমা ইয়াসমীন রিকাবীবাজার
ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা মেম্বার নির্বাচিত হন৷ ১৯৯৫ সালে তিনি
মিরকাদিম পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হন৷ এ সময়ে তিনি
রিকাবিবাজার এলাকার অসহায়, স্বামী পরিত্যক্তা মহিলাদের সেলাই,
শাকসবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালনসহ বিভিন্ন আয়বৃদ্ধিমূলক
কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করেন৷
মুন্সীগঞ্জ সদরের নগর কসবা, এনায়েত নগর, টেঙ্গর, কালিন্দিপাড়া,
রিকাবীবাজার পূর্ব পাড়া, রিকাবীবাজার পশ্চিম পাড়া, নৈদিঘীরপাড়,
রামগোপালপুর এবং নূরপুরসহ আরো অনেক গ্রামে যৌতুক, বাল্যবিবাহ ও
নারী নির্যাতন বন্ধ করার জন্য ১৯৯১ সাল থেকে নাসিমা ইয়াসমীন
কর্মশালা ও উঠান-বৈঠক শুরু করেন৷ এলাকার আশা ও ব্র্যাক অফিসের
কার্যালয়কে তিনি ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করেন৷ সপ্তাহের প্রতি
রবি ও সোমবার তিনি এ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন৷ ১৯৯৫ সালে
নাসিমা ইয়াসমীন রিকাবীবাজার ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের
পরিচালনা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন৷ একই বছর তিনি রিকাবীবাজার
বালিকা উচচ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষানুরাগী সদস্য
নির্বাচিত হন৷
যৌতুক, বাল্যবিবাহ বন্ধ, শিশু পার্ক স্থাপন এবং ইদ্রাকপুর
কেল্লাকে যাদুঘরে রূপান্তরিত করার জন্য ২০০৮ সনের ৮ ও ২৪ মার্চ
নাসিমা ইয়াসমীনের নেতৃত্বে মুন্সিগঞ্জ শহরের জেলা প্রশাসকের
কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়৷ এছাড়া পরিবেশ রক্ষার
জন্য একই বছরের ১২, ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর তার নেতৃত্বে
মুন্সিগঞ্জ জেলা সদরে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়৷ প্রায় ৫ শতাধিক
নারী পুরুষ এ মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেন৷ এরপর তিনি এলাকার গরিব,
মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিনামূল্যে বই সরবরাহ, বিনা বেতনে
লেখাপড়ার ব্যবস্থা, বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণসহ পোষাক প্রদানের
উদ্যোগ গ্রহণ করেন৷ এলাকার বিত্তশালী ব্যক্তিরা তাকে এ কাজে
সহযোগিতা করেন৷
১৯৯০ সালের ১৮ নভেম্বর নাসিমা ইয়াসমীনের নেতৃত্বে পদক্ষেপ সমাজ
কল্যাণ ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে৷ পদক্ষেপ সমাজ
কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতি সপ্তাহে ৫টি পরিবারের মধ্যে
বিনামূল্যে ডাক্তার দেখানো ও ঔষধ সরবরাহ করা হয়৷ এছাড়া এইডস
প্রতিরোধকল্পে সচেতনতামূলক কর্মশালা ও তামাক বিরোধী ক্যাম্পেইন
করা হয়ে থাকে৷ সংগঠনটির উদ্যোগে প্রতি বছর প্রায় ২ শত গরিব
মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলের পোশাক এবং বইপত্র দেয়া হয়ে থাকে৷
পদক্ষেপ সমাজ কল্যাণ ফাউন্ডেশন নির্যাতিতা নারীদের আইনগত সহায়তা,
সমাজের সুবিধাবঞ্চিত বেদে, জেলে, বাদ্যকর, কলু, মুচিদের মধ্যে
গণসচেনতা সৃষ্টি, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবাসহ পুনর্বাসনের
ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচেছন৷
ধূমপান বিরোধী কার্যক্রমের অন্যতম কর্মসূচি হিসাবে প্রতি মাসের
১০ থেকে ১২ তারিখে পদক্ষেপ সমাজ কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে
জেলা প্রশাসকের সাথে মিটিং হয়ে থাকে৷ মিটিং শেষ হওয়ার পর তারা
মোবাইল টিম নিয়ে জেলার গুরুত্বপুর্ণ স্থানসমূহ পরিদর্শন করেন৷
বাস টার্মিনাল, হাসপাতাল, লঞ্চঘাট ইত্যাদি স্থানে ধূমপানরত
অবস্থায় কাউকে পাওয়া গেলে তাদের কাছ থেকে ৫০ টাকা জরিমানা আদায়
করা হয়৷ এর ফলে এ সব উন্মুক্ত স্থানে ধূমপান করতে সাধারণ লোকজন
সাহস পায় না৷
মুন্সীগঞ্জ সদরের মাকুহাটি ইউনিয়নের মাকুহাটি গ্রামের দেলোয়ার
হোসেনের মেয়ে মাহমুদা বেগমের সাথে রিকাবী বাজারের তারামিয়ার
ছেলে কাউছার আহম্মেদের যৌতুকবিহীন বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন
নাসিমা ইয়াসমীন৷ ১৭ এপ্রিল, ২০০৮ তারিখে এ বিয়ের আয়োজন করে তিনি
এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন৷ এ দম্পত্তি বর্তমানে সুখেই আছেন৷
২০০৭ সালে নাসিমা ‘নারী কল্যাণ সমিতি’ নামক একটি সংগঠন গড়ে
তোলেন৷ অসহায়, নির্যাতিতা নারীদের আইনি সহায়তা প্রদান করা,
বিদেশগমনকারী নারীদের আর্থিক সহায়তা করার জন্য এ সংগঠনটি
পরিচিতি লাভ করে৷ রিকাবীবাজার পূর্বপাড়ার মাহবুব আলমের মেয়ে
তানিয়ার স্বামী তাকে বউ হিসেবে অস্বীকার করলে আইনি সহায়তার
মাধ্যমে নাসিমা তার সমাধান করার জন্য কাজ করেছেন৷
মুন্সীগঞ্জ সদরের রিকাবীবাজারের নগর কসবা গ্রামের সিরাজ মিয়ার
কন্যা রোকসানার বিয়ে হয় নারায়ণগঞ্জের আলীর টেক ইউনিয়নের
বিপ্লবের সাথে৷ বিয়ের পর পরই ছেলে মেয়েকে যৌতুকের জন্য চাপ দিতে
থাকে৷ যৌতুক দিতে না পারায় মেয়েকে তিন বছর বাবার বাড়ি রেখে দেয়া
হয়েছে৷ মীরকাদিম পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদের
মেম্বারদের সহায়তায় নাসিমা গ্রাম সালিশের মাধ্যমে তা মীমাংসা
করে দেন৷ যার ফলে রোকসানা তার স্বামীকে নিয়ে সুখেই সংসার করছেন৷
আমাদের সমাজের কুসংস্কার দূর করে সমাজে নারীদের অবস্থান আরো
সুদৃঢ় করার জন্য অন্যান্য নারীদেরও এগিয়ে আসতে হবে৷ নাসিমা
ইয়াসমীনের উৎসাহ অনুপ্রেরণায় মুন্সীগঞ্জ থেকে আরো ২১ জন নারী
‘নারী নেতৃত্বের বিকাশ’ শীর্ষক ফাউন্ডেশন কোর্সে অংশগ্রহণ
করেছেন৷ অচিরেই তারা মুন্সীগঞ্জে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন
বলে নাসিমা আশাবাদী৷ নতুন নারী নেত্রীদের সাথে নিয়ে চলতি বছরের
৩১ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি মুন্সীগঞ্জ সদরের পঞ্চসার
ইউনিয়নে একটি উজ্জীবক প্রশিক্ষণও করেছেন৷ ৮০ জন প্রশিক্ষণার্থী
এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছেন৷ তার মধ্যে ৭০ জন অংশগ্রহণকারীই
নারী ছিলেন৷ মুন্সীগঞ্জ সদরের প্রতিটি ইউনিয়নে নাসিমা উজ্জীবক
প্রশিক্ষণ করার জন্য পরিকল্পনা করেছেন৷ এভাবেই তিনি
মুন্সীগঞ্জের গ্রামে গ্রামে নারীমুক্তির বাণী পৌঁছে দিতে চান৷
|