General Publications

 
Search  ...a  page
Main Links
 
standing Committee of Forum
 
নারীর কথা-৪

 

সম্পাদকীয়

নারী নির্যাতনের স্বরূপ ও আমাদের বিবেক

যে কথা যায় না বলা

আলোকিত আরতি
আসমা ও তার নারী কল্যাণ সংস্থা
আঁধারে আশার প্রদীপ
আত্মবিশ্বাসী দোলনা
আনোয়ারার সংগ্রাম চলছে
এলাচি কথন
এক নিরলস নারী সংগঠক
এক স্বাবলম্বী নারীর একান্ত কথা
এখন তিনি এলাকার সফল নেত্রী
কিশোরগঞ্জের শিখা: এক লড়াকু সংগ্রামী
জীবন সংগ্রামে জয়ী জাহানারা
জেসমিনের স্বপ্ন: আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ
দৃঢ় প্রত্যয়ী নাসিমা
রামুর নারী উন্নয়নের প্রতীক
লুৎফা: এক অনুপ্রেরণার নাম
সাজেদা মেম্বার হতে চায়
সাঈদা: অসহায় মানুষের পাশে
সব বাধাই হার মানলো
সাহস করেই স্বপ্ন দেখি
বাঘিয়ার বাহারজান
নকশিকাঁথা: জীবনের রঙিন ফোঁড়

ইভানের কথা

 

আনোয়ারার সংগ্রাম চলছে
রোকসানা কনা

  ‘আর কতকাল এভাবে কাটাব!’- দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাগুলো বলছিলেন নোয়াপাড়া গ্রামের আনোয়ারা৷ নারী নেতৃত্ব বিকাশের ট্রেনিং- এর পর তার গল্প বলছিলেন আমাদের৷ ষাটোর্দ্ধ বয়স৷ দারিদ্র্য তাকে গ্রাস করেছে, তবু দেখছিলাম তার চোখে মুখে এক অদ্ভুত দীপ্তি৷ বলছিলেন- ‘তবুও ভাবি, যদি এমন কিছু করা যায়; যাতে দারিদ্র্য আর দুঃখের গভীর অাঁধারে কোনো মেয়ের জীবন যেন হারিয়ে না যায়?’

মোসাম্মৎ আনোয়ারা বেগমের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি৷ গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার নোয়াপাড়া গ্রামে৷ সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়৷ মা গৃহিনী৷ বাবা কৃষি কাজের পাশাপাশি ভেষজ ওষুধ তৈরি ও বিক্রি করতেন৷ এ দু থেকে অর্জিত অর্থ দিয়েই সংসার চলে যেত স্বচছলভাবেই৷ নোয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন তিনি৷ কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোতেই শেষ হয়ে যায় তার শিক্ষাজীবন৷ হাইস্কুল ছিল অনেক দূরে৷ নিরাপত্তার কথা ভেবে বাবা মেয়ে আনোয়ারাকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেননি৷ তাই পড়াশুনা বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি৷ ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করতেন৷ পাশাপাশি বাবার কাছ থেকে ভেষজ ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়াগুলো শিখতে থাকেন আনোয়ারা৷

আনোয়ারার বয়স চৌদ্দ বছর৷ পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ে হয় তার৷ স্বামী ঘোড়াশাল জুট মিলে চাকরি করতেন৷ চাকরির সুবাদে দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতেন তার স্বামী৷ ঘরের সব কাজ করেও শ্বশুর-শাশুড়ির মন জয় করতে পারেননি তিনি৷ স্বামীর অনুপস্থিতিতে আনোয়ারার ওপর চলতো অমানুষিক নির্যাতন৷ আনোয়ারা পুত্র সন্তানের মুখ চেয়ে সব অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করতে থাকেন৷ কিন্তু অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বাড়তেই থাকে৷ শ্বাশুড়ি ও দেবরের উস্কানিতে স্বামীও অত্যাচার করা শুরু করেন৷ এরইমধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো গর্ভবতী হন তিনি৷ স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচারে বিপর্যস্ত আনোয়ারা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন৷ নিরুপায় হয়ে বাবার হাত ধরে শ্বশুরালয় ত্যাগ করেন তিনি৷

স্বামীর বাড়ি ছেড়ে এলেও দুর্ভাগ্য তার পিছু ছাড়েনি৷ বাবার বাড়ি ফিরে আসা তার ভাইরা মেনে নেননি৷ এরমধ্যেই হঠাৎ মারা যান তার বাবা৷ শুরু হয় তার ওপর মানসিক নির্যাতন৷ আনোয়ারার দ্বিতীয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথেই তার ভাইরা তার দুই সন্তানকে তাদের দাদাবাড়ি পাঠিয়ে দেন৷ আনোয়ারার হাজারো অনুরোধ আর আর্তনাদেও তাদের মন এতটুকু গলেনি! এখানেই শেষ নয়৷ তারা ইচেছর বিরুদ্ধে আনোয়ারাকে দ্বিতীয় বিয়ে দেন৷

আনোয়ারার দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন মানসিকভাবে অসুস্থ৷ তিনি কোনো কাজ করতেন না৷ উপরন্তু আনোয়ারার কাছে টাকা চাইতেন৷ কারণে-অকারণে তাকে মারধোর করতেন, অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করতেন৷ এমনকি তাকে বাবার বাড়ি আসতে দিতেন না৷ একে একে আনোয়ারা তিন পুত্র ও এক কন্যার জননী হন৷ সন্তানের ভরণপোষণের কোনো দায়িত্ব তার স্বামী পালন করতেন না৷ সংসার চালানোর জন্য আনোয়ারা মানুষের বাড়িতে কাজ করতে শুরু করেন৷ একইসাথে বাবার কাছ থেকে শেখা ভেষজ ওষুধ তৈরির কাজ করতে থাকেন৷ মূলত এই ওষুধ বিক্রির আয়েই তার সংসার খরচ চলতে থাকে৷ সন্তানদের জন্য অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান হলেও তাদের সবাইকে স্কুলে পড়ানো সম্ভব ছিল না আনোয়ারার পক্ষে৷ তবুও তার আপ্রাণ চেষ্টায় সকলেই শেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা৷ এভাবেই অভাব-অনটনে সংসার চলতে থাকে৷ ১৯৯৪ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর তার সৎছেলে তাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়৷ আবারো ঘরহারা হন আনোয়ারা৷

কিন্তু এবারও মনোবল হারান না আনোয়ারা৷ চার সন্তানসহ চলে আসেন কালীগঞ্জ৷ একটি ছোট বাসাভাড়া করেন৷ নতুনভাবে শুরু করেন ভেষজ ওষুধ তৈরি ও বিক্রির কাজ৷ জুটমিলের শ্রমিক হাসিন আলী ভুঁইয়াকে বিয়ে করে আবারও সংসার শুরু করেন৷ ১৯৯২ সালে ব্র্যাক আয়োজিত সেবিকা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন৷ একইসাথে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে হাঁস-মুরগি পালনের ওপর প্রশিক্ষণ নেন৷ নিজ গ্রামে সেবিকা হিসেবে কাজ করা শুরু করেন৷ বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করতেন৷ এছাড়া মডার্ন হারবাল কোম্পানি নামক একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সদস্য হন৷ এই প্রতিষ্ঠান থেকে ওষুধ কিনে স্থানীয় লোক ও পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করেন৷ সংসারে সকলের অন্ন-বস্ত্রের যোগান দিতে হতো আনোয়ারাকেই৷ সংগ্রামী আনোয়ারা সন্তানদের স্বাবলম্বী করে তোলেন৷ তিন পুত্র তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে৷ কিস্তু এরই মধ্যে তার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ স্বামীর সেবা-যত্ন ও চিকিৎসার ব্যয় ভারও তিনি বহন করেছেন৷

অভাব অনটনের সংসার সচল রাখতে প্রাণান্ত পরিশ্রম করতে হত আনোয়ারাকে৷ সাংসারিক সকল কাজ আর কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন তিনি৷ সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মাঝেও তিনি ভাবতেন সমাজের অসহায় আর অবহেলিত মানুষের জন্য কিছু করা প্রয়োজন৷ বিশেষত নির্যাতিত নারীদের জন্য কাজ করার তাগিদ অনুভব করতেন তিনি৷

গাজীপুরের নারীনেত্রী নাহিদ সুলতানার কাছে জানতে পারেন বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের নানান কার্যক্রম ও সামাজিক উদ্যোগ বিষয়ে৷ নারীদের নানা কার্যক্রমের সফলতার চিত্র আনোয়ারাকে আগ্রহী করে তোলে৷ ২০০৬ সালে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ কেন্দ্রিয় অফিসে আয়োজিত দ্বিতীয় নারী নেতৃত্ব বিকাশ ফাউন্ডেশন কোর্সে অংশগ্রহণ করেন৷ প্রশিক্ষণে তার মনে হয়েছে, আরো আগে সুযোগ পেলে তা তার জীবনের চলার পথে অনেক বেশি সহায়ক ভূমিকা রাখতো৷ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বঞ্চনার স্বীকার হতে হতো না৷ নিজের অধিকার আদায়ে তিনি অনেক বেশি সচেষ্ট হতে পারতেন৷

আনোয়ারা অর্থনৈতিকভাবে নিজের দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে চান৷ তিনি স্বামীর উন্নত চিকিৎসা করাতে চান৷ একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে চান৷ তিনি মনে করেন, তার মেধা আর দক্ষতা রয়েছে৷ শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় মূলধনের যোগান পেলে তিনি সচছল জীবন যাপন করতে পারবেন৷ আনোয়ারা সমাজের অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী করার কাজে ভূমিকা রাখতে চান৷ এই বৃদ্ধ বয়সেও তিনি নিপীড়িত নারীদের কল্যাণের কথা সর্বদা অনুভব করেন৷

 

 
 

National Girl Child Advocacy Forum

 

Contact Us

3/7 Asad Avenue Mohammodpur, Dhaka-1207

Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975, Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net