| Main Links |
| |
|
standing Committee of Forum |
| |
|
নারীর কথা-৪ |
|
|
|
|
আনোয়ারার সংগ্রাম চলছে
রোকসানা কনা |
|
|
‘আর কতকাল এভাবে কাটাব!’-
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাগুলো বলছিলেন নোয়াপাড়া গ্রামের আনোয়ারা৷
নারী নেতৃত্ব বিকাশের ট্রেনিং- এর পর তার গল্প বলছিলেন আমাদের৷
ষাটোর্দ্ধ বয়স৷ দারিদ্র্য তাকে গ্রাস করেছে, তবু দেখছিলাম তার
চোখে মুখে এক অদ্ভুত দীপ্তি৷ বলছিলেন- ‘তবুও ভাবি, যদি এমন কিছু
করা যায়; যাতে দারিদ্র্য আর দুঃখের গভীর অাঁধারে কোনো মেয়ের
জীবন যেন হারিয়ে না যায়?’
মোসাম্মৎ আনোয়ারা বেগমের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি৷
গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার নোয়াপাড়া গ্রামে৷ সাত ভাই-বোনের
মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়৷ মা গৃহিনী৷ বাবা কৃষি কাজের পাশাপাশি
ভেষজ ওষুধ তৈরি ও বিক্রি করতেন৷ এ দু থেকে অর্জিত অর্থ দিয়েই
সংসার চলে যেত স্বচছলভাবেই৷ নোয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
শিক্ষাজীবন শুরু করেন তিনি৷ কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি
পেরোতেই শেষ হয়ে যায় তার শিক্ষাজীবন৷ হাইস্কুল ছিল অনেক দূরে৷
নিরাপত্তার কথা ভেবে বাবা মেয়ে আনোয়ারাকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি
দেননি৷ তাই পড়াশুনা বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি৷ ঘরের কাজে মাকে
সাহায্য করতেন৷ পাশাপাশি বাবার কাছ থেকে ভেষজ ওষুধ তৈরির
প্রক্রিয়াগুলো শিখতে থাকেন আনোয়ারা৷
আনোয়ারার বয়স চৌদ্দ বছর৷ পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ে হয় তার৷
স্বামী ঘোড়াশাল জুট মিলে চাকরি করতেন৷ চাকরির সুবাদে দিনের
বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতেন তার স্বামী৷ ঘরের সব কাজ করেও
শ্বশুর-শাশুড়ির মন জয় করতে পারেননি তিনি৷ স্বামীর অনুপস্থিতিতে
আনোয়ারার ওপর চলতো অমানুষিক নির্যাতন৷ আনোয়ারা পুত্র সন্তানের
মুখ চেয়ে সব অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করতে থাকেন৷ কিন্তু
অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বাড়তেই থাকে৷ শ্বাশুড়ি ও দেবরের
উস্কানিতে স্বামীও অত্যাচার করা শুরু করেন৷ এরইমধ্যে
দ্বিতীয়বারের মতো গর্ভবতী হন তিনি৷ স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির
অত্যাচারে বিপর্যস্ত আনোয়ারা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন৷ নিরুপায়
হয়ে বাবার হাত ধরে শ্বশুরালয় ত্যাগ করেন তিনি৷
স্বামীর বাড়ি ছেড়ে এলেও দুর্ভাগ্য তার পিছু ছাড়েনি৷ বাবার বাড়ি
ফিরে আসা তার ভাইরা মেনে নেননি৷ এরমধ্যেই হঠাৎ মারা যান তার
বাবা৷ শুরু হয় তার ওপর মানসিক নির্যাতন৷ আনোয়ারার দ্বিতীয়
সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথেই তার ভাইরা তার দুই সন্তানকে
তাদের দাদাবাড়ি পাঠিয়ে দেন৷ আনোয়ারার হাজারো অনুরোধ আর
আর্তনাদেও তাদের মন এতটুকু গলেনি! এখানেই শেষ নয়৷ তারা ইচেছর
বিরুদ্ধে আনোয়ারাকে দ্বিতীয় বিয়ে দেন৷
আনোয়ারার দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন মানসিকভাবে অসুস্থ৷ তিনি কোনো
কাজ করতেন না৷ উপরন্তু আনোয়ারার কাছে টাকা চাইতেন৷ কারণে-অকারণে
তাকে মারধোর করতেন, অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করতেন৷ এমনকি তাকে
বাবার বাড়ি আসতে দিতেন না৷ একে একে আনোয়ারা তিন পুত্র ও এক
কন্যার জননী হন৷ সন্তানের ভরণপোষণের কোনো দায়িত্ব তার স্বামী
পালন করতেন না৷ সংসার চালানোর জন্য আনোয়ারা মানুষের বাড়িতে কাজ
করতে শুরু করেন৷ একইসাথে বাবার কাছ থেকে শেখা ভেষজ ওষুধ তৈরির
কাজ করতে থাকেন৷ মূলত এই ওষুধ বিক্রির আয়েই তার সংসার খরচ চলতে
থাকে৷ সন্তানদের জন্য অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান হলেও তাদের সবাইকে
স্কুলে পড়ানো সম্ভব ছিল না আনোয়ারার পক্ষে৷ তবুও তার আপ্রাণ
চেষ্টায় সকলেই শেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা৷ এভাবেই অভাব-অনটনে
সংসার চলতে থাকে৷ ১৯৯৪ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর তার সৎছেলে তাকে
ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়৷ আবারো ঘরহারা হন আনোয়ারা৷
কিন্তু এবারও মনোবল হারান না আনোয়ারা৷ চার সন্তানসহ চলে আসেন
কালীগঞ্জ৷ একটি ছোট বাসাভাড়া করেন৷ নতুনভাবে শুরু করেন ভেষজ
ওষুধ তৈরি ও বিক্রির কাজ৷ জুটমিলের শ্রমিক হাসিন আলী ভুঁইয়াকে
বিয়ে করে আবারও সংসার শুরু করেন৷ ১৯৯২ সালে ব্র্যাক আয়োজিত
সেবিকা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন৷ একইসাথে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর
থেকে হাঁস-মুরগি পালনের ওপর প্রশিক্ষণ নেন৷ নিজ গ্রামে সেবিকা
হিসেবে কাজ করা শুরু করেন৷ বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করতেন৷ এছাড়া
মডার্ন হারবাল কোম্পানি নামক একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক
প্রতিষ্ঠানের সদস্য হন৷ এই প্রতিষ্ঠান থেকে ওষুধ কিনে স্থানীয়
লোক ও পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করেন৷ সংসারে সকলের
অন্ন-বস্ত্রের যোগান দিতে হতো আনোয়ারাকেই৷ সংগ্রামী আনোয়ারা
সন্তানদের স্বাবলম্বী করে তোলেন৷ তিন পুত্র তাদের নিজ নিজ
ক্ষেত্রে অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে৷ কিস্তু এরই মধ্যে তার স্বামী
অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ স্বামীর সেবা-যত্ন ও চিকিৎসার ব্যয় ভারও তিনি
বহন করেছেন৷
অভাব অনটনের সংসার সচল রাখতে প্রাণান্ত পরিশ্রম করতে হত
আনোয়ারাকে৷ সাংসারিক সকল কাজ আর কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব অত্যন্ত
নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন তিনি৷ সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মাঝেও
তিনি ভাবতেন সমাজের অসহায় আর অবহেলিত মানুষের জন্য কিছু করা
প্রয়োজন৷ বিশেষত নির্যাতিত নারীদের জন্য কাজ করার তাগিদ অনুভব
করতেন তিনি৷
গাজীপুরের নারীনেত্রী নাহিদ সুলতানার কাছে জানতে পারেন বিকশিত
নারী নেটওয়ার্কের নানান কার্যক্রম ও সামাজিক উদ্যোগ বিষয়ে৷
নারীদের নানা কার্যক্রমের সফলতার চিত্র আনোয়ারাকে আগ্রহী করে
তোলে৷ ২০০৬ সালে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ কেন্দ্রিয় অফিসে
আয়োজিত দ্বিতীয় নারী নেতৃত্ব বিকাশ ফাউন্ডেশন কোর্সে অংশগ্রহণ
করেন৷ প্রশিক্ষণে তার মনে হয়েছে, আরো আগে সুযোগ পেলে তা তার
জীবনের চলার পথে অনেক বেশি সহায়ক ভূমিকা রাখতো৷ জীবনের প্রতিটি
ক্ষেত্রে বঞ্চনার স্বীকার হতে হতো না৷ নিজের অধিকার আদায়ে তিনি
অনেক বেশি সচেষ্ট হতে পারতেন৷
আনোয়ারা অর্থনৈতিকভাবে নিজের দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে চান৷ তিনি
স্বামীর উন্নত চিকিৎসা করাতে চান৷ একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যৎ
সুরক্ষিত করতে চান৷ তিনি মনে করেন, তার মেধা আর দক্ষতা রয়েছে৷
শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় মূলধনের যোগান পেলে তিনি সচছল জীবন যাপন
করতে পারবেন৷ আনোয়ারা সমাজের অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী করার
কাজে ভূমিকা রাখতে চান৷ এই বৃদ্ধ বয়সেও তিনি নিপীড়িত নারীদের
কল্যাণের কথা সর্বদা অনুভব করেন৷ |
|
|
|
|
|
National
Girl Child Advocacy Forum |
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |
|