|
|
মেয়েটির নাম লুৎফুন নাহার৷ সবাই
ডাকতো লুৎফা৷ ১৯৬২ সালের ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় এক দরিদ্র
পরিবারে তার জন্ম৷ বাবা মো: আব্দুল বারী আর মা রেজিয়া বেগমের
আট সন্তানের মধ্যে লুৎফা সবার বড়৷ ছোটবেলা থেকেই দেশের একজন
প্রতিষ্ঠিত মানুষ হওয়ার স্বপ্ন নিজের মধ্যে গোপনে লালন করতে
থাকেন৷
লুৎফা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সহপাঠী এবং মুক্তাগাছার মেয়েদের
সাথে নিজ উদ্যোগে গান ও নাচ শিখেন৷ বিদ্যালয় ও এলাকার বিভিন্ন
অনুষ্ঠানে, নৃত্য পরিবেশন করে ব্যাপক প্রশংসিত হন তিনি৷ আর
অন্যদিকে খেলাধুলায়ও সুনাম অর্জন করতে থাকেন সমান ভাবে৷ শটপুট,
হাইজাম্প ও বর্শা নিক্ষেপে তিনি প্রথম একজন মেয়ে হিসেবে এ
অঞ্চল থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও বিজয়ী হওয়ার
গৌরব অর্জন করেন৷ কিন্তু প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলেও আসল জায়গায়
হেরে যান লুৎফা৷ পিতাসহ অন্যান্য অভিভাবকগণ বুঝতে পারেন লুৎফা
বড় হয়ে গেছে৷ আর গান বাজনা, খেলাধুলা নয়৷ লুৎফার বিয়ের কথা
ভেবেই সবকিছু বন্ধ করে দিতে হবে৷ যেই কথা সেই কাজ- এক কথায়
বন্ধ হয়ে গেল সব৷ পড়াশুনাও বন্ধ হয়ে যেতে পারত৷ কিন্তু বাকিগুলো
জীবনে আর করবেন না বলে একরকম নাকে খত দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে
যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেল৷
সময়ের ধারাবাহিকতায় লুৎফা ১৯৭৮ সালে মুক্তাগাছা এনএন বালিকা
বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন৷ এরপর সবার হাতেপায়ে ধরে জোটে
কলেজে ভর্তি হওয়ার অনুমতি৷ লুৎফার কলেজ জীবনের তিনমাস অতিক্রম
না হতেই একদিন তার নানা কলেজে ক্লাস চলাকালীন দরকারী কাজ আছে
বলে বাড়তে ডেকে নিয়ে আনেন৷ বাড়িতে এসে লুৎফা দেখতে পান তার
বিয়ের আয়োজন চলছে৷ মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তার বিয়ে হয়ে যায়৷
দরিদ্র পিতার বাড়িতে শত অভাবের বিড়ম্বনা, ক্ষুধার তীব্র জ্বালা
থেকে শুরু করে হাজারো কষ্টও অনেক মেয়ে হাসিমুখে মেনে নেয়৷ তারা
ভাবে যে বিয়ে হলে স্বামীর বাড়িতে হয়তো সুখে শান্তিতে বাকি
জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবে৷ লুৎফাও সে আশায় বুক বেধেছিলেন
অন্যদের মত, কিন্তু বিয়ে তার জন্য কোনো নতুন প্রত্যাশার বার্তা
তো নিয়ে আসেনি৷ বরং তা লুৎফাকে করে চরমভাবে আশাহত! বিয়ের
তিনদিনের মাথায় লুৎফা জানতে পারেন তার স্বামী আগে আরো দুটি বিয়ে
করেছেন এবং তার একাধিক সন্তানও রয়েছে৷ সে সময় লুৎফা তার
স্বামীসহ বাবার বাড়িতেই ছিলেন ৷
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চূড়ান্ত পরিণতির কথা উপলব্ধি করে লুৎফাকে
এ বিয়ে মেনে নিতে হয়৷ নারীত্ব আত্মমর্যাদাবোধ আর মান সম্মানের
কাছে হতে হয় চরমভাবে পরাজিত৷ তবে তার আর স্বামীর বাড়ি যাওয়া
হয়নি৷ এ ধরনের একটা কাণ্ড ঘটানোর খবর স্বামীর আগের স্ত্রী ও
সন্তানেরা টের পেয়ে যায় এবং তারা খুবই ক্ষুব্ধ হন৷ ফলে স্বামীও
লুৎফার সাথে তার বাবার বাড়িতে থেকে যায়৷ এ দিকে পারিবারিক কলহে
তার বাবার যা সম্পত্তি ছিল, তার অধিকাংশ প্রায় হারিয়ে ফেলে৷
শুরু হয় দুর্ভাগ্যের আরেক পর্ব৷ মাথাগোঁজার মতো ঠাঁইও থাকে না
লুৎফার৷ অন্যের আশ্রয়ে থাকা, নিজের কোনো আয় নাই, স্বামীরও নাই
কোনো বৃত্তি৷ এরকম দুঃসহ অবস্থায় তাকে মা হতে হয় চার চারটি
সন্তানের৷ অভাব, তীব্র ক্ষুধার জ্বালায় জীবনমরণ সংগ্রামে
নিপতিত হয় লুৎফা আর তার সন্তানদের জীবন৷ তার ভাষায় ‘কতদিন না
খেয়ে থাকতে হয়েছে, ক্ষুধার্ত সন্তানের কান্না স্বচক্ষে দেখতে
হয়েছে, এরকম এ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়জন আছে কিনা তার হিসাব নেই৷’
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়েই একজন স্বেচছসেবী হিসেবে লুৎফা জাতীয়
মহিলা সংস্থার ইউনিট সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করতেন৷ সে সময়
তার কিছু বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রও চালু ছিল৷ লুৎফা তার অর্থাভাব
দূর করার জন্য তার এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক কাজী ফিরোজা ইসলামের
সহযোগিতায় একটি স্কুল চালুর উদ্যোগ নেন৷ ১৯৮০ সালে তাদের যৌথ
উদ্যোগে মুক্তাগাছা আদর্শ উচচ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়৷ লুৎফা
স্কুলে মাত্র তিনশ টাকা মাসিক বেতনে শিক্ষকতার চাকরি নেন৷ নানা
দুঃখ-কষ্ট আর খেয়ে না খেয়ে যখন লুৎফার জীবন চলছিল, তখন তার
জীবনে নেমে আসে আরেক ভয়াবহ বিপদ৷ লুৎফার স্বামী হঠাৎ করে
মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন৷ এ যেন নিয়তির নিষ্ঠুর পরীক্ষা৷
চার চারটি ছেলেমেয়ে আর পাগল স্বামীকে নিয়ে লুৎফা হয়ে যান
একেবারে অসহায়৷ তখন কী করবেন কোথায় যাবেন এসব ভেবে একেবারেই
হতবুদ্ধি হয়ে যান তিনি৷ চরম অস্বস্তির মধ্যে থেকে মাথাও ঠিক
কাজ করে না৷ এছাড়া একাধিক বিয়ে করা স্বামীর সাথে বিয়ে হওয়ার
কারণে সামাজিক গঞ্জনা তো আছেই৷
লুৎফার সামান্য আয়ে (মাসিক তিন শত টাকা) তখন বেঁচে আছেন তার
চারটি সন্তান আর মানসিক ভারসাম্যহীন স্বামী৷ নিয়তির নিমর্ম
পরিহাসকে মেনে নিয়েই চলতে থাকে লুৎফার জীবন৷ তবু লুৎফা পরাজিত
হতে চাননি৷ জয়ী তাকে হতেই হবে৷ প্রতিদিন রাতে ভাবেন, হয়তো
আগামীকাল সকালটা নতুন কোনো সুসংবাদ নিয়ে আসবে; হয়তো বেঁচে
থাকার কোনো অবলম্বন খুঁজে পাবেন৷ কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয়
আরেত- হঠাৎ একদিন স্কুলে গিয়ে জানতে পারেন স্কুলের অন্যতম
প্রতিষ্ঠাতা কাজী ফিরোজা ইসলাম কাউকে কিছু না বলে বিদেশে চলে
গেছেন৷ তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে৷ নিজের লেখাপড়ার দৌড় তো অল্প,
এ স্কুল এখন কে চালাবেন আর স্কুল না চললে তার তিনশত টাকা
বেতনের কী হবে! তিনি কী করে বাঁচবেন!
পিঠ যখন দেয়ালে গিয়ে ঠেকে তখন তো আর পিছানোর সুযোগ নেই৷ তাই
আত্মবিশ্বাসী লুৎফা গোটা স্কুলটা পরিচালনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে
নিয়ে নেন৷ কিন্তু সেখানেও অনেক বাঁধা৷ একদিন জানা গেল স্কুলটা
অর্পিত সম্পত্তির মধ্যে গড়ে উঠেছে৷ এলাকার প্রভাবশালীরা তাকে
এবং এ স্কুলটাকে গায়ের জোরে উৎখাত করার জন্য উঠে পড়ে লাগলো৷ তার বিরুূদ্ধে থানায় মামলা ঠুকে দেয়া হল৷ চলতে থাকল ব্যাপক
হয়রানি৷ কিন্তু তার পরও চলতে থাকল লুৎফার জীবনসংগ্রাম৷ লুৎফা
স্কুলের মেয়েদেরকে এমনভাবে সংগঠিত করলেন যে, যেদিন
দুস্কৃতকারীরা স্কুলটাকে জবরদখল করতে আসল স্কুলের সকল মেয়েরা
দা, বটি, লাঠিসোঠা নিয়ে তাদের প্রতিহত করে স্কুলের দখল টিকিয়ে
রাখে৷ লুৎফার দৃঢ় মনোবল ও বিচক্ষণতার জন্য এ প্রতিষ্ঠান
নির্ঘাত ধবংসের হাত থেকে রক্ষা পায়৷
তবু লুৎফার জীবনের দুর্ভাগ্যের ইতিহাস শেষ হয় না৷ বিদ্যালয়টি
কিছুটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পর তার জীবনে যখন কিছুটা সচছলতা
আসে, তিনি তার এবং সন্তানদের মাথা গোঁজার মত স্থানীয় এক পীরের
কাছ থেকে নগদ দামে দুই শতাংশ জমি ক্রয় করেন৷ সেখানে ঘর বানান
এবং সন্তানসহ বসবাস করেন৷ কিন্তু হঠাৎ জানা গেল ঐ পীরের লোকজন
একই জমি আগেই অন্য কারো কাছে বিক্রি করে রেখেছিলেন৷ ফলে এ
অবস্থায় নিজের অতিকষ্টে অর্জিত অর্থ দিয়ে কেনা দুই শতাংশ জায়গা
থেকেও তাকে উৎখাত হয়ে অন্যের আশ্রয়ে চলে যেতে হয়৷ যাই হোক
সংগ্রামী মানসিকতা আর লড়াকু মেজাজ যার জীবনের সাথে মিশে রয়েছে,
তাকে তো বিজয়ী হতেই হবে৷ কোনো বাধাই তার গতিপথকে রুদ্ধ করতে
পারবে না৷ ঠিক তেমনি অবশেষে লুৎফাও হারেনি তার জীবন সংগ্রামে৷
১৯৮০ সালে শত অভাবের মধ্যেও তার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি এখন
মুক্তাগাছার মধ্যে একটি মডেল শিক্ষাপীঠ হিসেবে সর্বমহলে
প্রশংসিত এবং এর ছাত্রী সংখ্যা এখন প্রায় হাজার৷ শিক্ষক সংখ্যা
এখন বাইশ৷ লুৎফুন নাহার এখন তার বিদ্যালয়ের সর্বজনের কাছে
সম্মানিত একজন শিক্ষয়িত্রী৷ হাজারো মেয়েদের কাছে তিনি জীবন
সংগ্রামের প্রেরণা৷
স্কুলের সাফল্যে যখন তার জীবনে স্বচছলতা ফিরে এসেছে তখন লুৎফা
শুরু করেছেন আরেক নতুন সংগ্রাম৷ সমাজের অবহেলিত ও দরিদ্র
নারীদের জন্য কিছু করার প্রত্যয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন মুক্তাগাছা
বহুমুখী সমাজ কল্যাণ মহিলা সংস্থা নামে একটি আর্থসামাজিক
প্রতিষ্ঠান৷ এর মধ্যে দিয়ে মেয়েদের নিয়ে বাঁশ-বেত, উল,
কুশি-কাটা, কুটির শিল্প, বয়স্ক শিক্ষা প্রভৃতি কাজের মধ্যদিয়ে
এলাকার অসংখ্য নারীকে স্বাবলম্বী করতে সক্ষম হয়েছেন৷ শুধু
আর্থিক সাফল্য নয় এ সংগঠনের মধ্যদিয়ে বিপদগ্রস্থ নারীদের আইনি
সহায়তা, বাল্যবিবাহ বন্ধ, যৌতুকমুক্ত বিবাহের ব্যবস্থা, অবৈধ
তালাকের বিরুদ্ধে আইনি উদ্যোগ প্রভৃতি নানামুখী কার্যক্রম
পরিচালিত হচেছ৷ এ ধরনের কাজ পরিচালনার একপর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে
লুৎফা হাঙ্গার প্রজেক্টের ৮৪৪তম উজ্জীবক প্রশিক্ষণে অংশ নেন৷
তার ভাষায় হাঙ্গার প্রজেক্টের সাথে তার এ সংযুক্তি তার আন্দোলনে
এক অভাবনীয় গতি সঞ্চার করেছে৷ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই
চলবে৷ এ ভাবনা তিনি হাঙ্গার প্রজেক্টের কাছ থেকে পেয়েছেন৷ ফলে
তিনি হতে পেরেছেন জীবন সংগ্রামে একজন সাহসী সৈনিক৷
লুৎফুন নাহার আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেরও এক সাহসী সৈনিক৷
একাত্তরে মাত্র নয় বছর বয়সী লুৎফা এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে,
তাদের বাড়ির পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা সশস্ত্র মানুষগুলো দেশের
স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য নিবেদিত৷ সুতরাং তাদের কাছে লুকিয়ে
খাবার ও পানি পৌঁছে দেয়া ছিল তার নৈতিক দায়িত্ব৷ এ কাজটি
একাত্তরে তিনি অত্যন্ত নিবেদিত ভাবেই করেছিলেন৷ স্বাধীন এ দেশ
তাকে অনেক লাঞ্ছনা গঞ্জনা দিলেও এতে তার কোনো দুঃখ নাই৷ কারণ
তার ভাষায় দেশে অনেক ভালো মানুষ আছে৷ ভালো মানুষগুলো তার মতই
অসহায় ৷ তাদের সবার এক হয়ে সত্যের জন্য লড়াই করা উচিত৷
বর্তমানে ৪৭ বছরের লুৎফুন নাহার মনে করেন তার কৈশোরের স্বপ্ন
একেবারে বৃথা যায়নি৷ তিনি নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ বলেই
মনে করেন৷ ব্যক্তিজীবনে শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থেকেও তিনি তার
প্রতিটি সন্তানকে শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত ও আদর্শবাদী মানুষ হিসেবে
গড়ে তুলতে পেরেছেন৷ সমাজের সবাই আজ তার কথা শোনে৷ যে কোনো
অনুষ্ঠানে আজ তাকে ডাকা হয়৷ তার প্রতিষ্ঠিত গোটা স্কুলটি আজ
তার পরামর্শ মত পরিচালিত হয়৷ সমাজের অনেক শিক্ষিত নারী আজ তার
মত হতে চায়৷ আজ মুক্তাগাছার তৃণমূল পর্যায়ে লুৎফার গড়ে তোলা
সংগঠনটিকে দুস্থ ও নির্যাতিত নারীদের আশা আকাঙক্ষার প্রতীক
হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ শত প্রতিকূলতার মধ্যেও এটুকু অর্জন তাকে
পরিতৃপ্ত করে৷
|
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |