|
|
নবজাতক ছেলে হবে না মেয়ে তা ঠিক করেন সৃষ্টিকর্তা৷ কিন্তু মেয়ে
হলে দোষ হয় মায়ের৷ আর সাধারণত দোষটা দেন শাশুড়ি আর অন্যান্য
আত্মীয়রা৷ শত লাঞ্ছনা গঞ্জনা শুনতে শুনতে বউটির জীবন যখন
অতিষ্ঠ তখনই শুনতে হয় বংশ রক্ষার জন্য আরেকটা নুতন বউ আনার চরম
খবর৷ এ খেলা এ দেশের এক অতি সাধারণ ঘটনা৷ তবে কবে থেকে এ খেলা
শুরু হয়েছিল তা বলা মুশকিল৷ মনে হয় যখন থেকে পুরুষতান্ত্রিক
সমাজের সূত্রপাত হয় তখন থেকেই৷ পুত্র সন্তানের জন্য কত বলী, কত
লাঞ্ছনা, কত সংসার ভাঙার কাহিনী৷ তবে এর পরিসংখ্যান আমার জানা
নাই, কোথাও লেখা আছে বলেও শুনিনি৷
সে কালের কন্যাশিশু আগমনের কথা, পরিবারের অবস্থার কথা বলতে গিয়ে
মনে পড়ে আমার জন্মের সময়ের কথা৷ গত শতাব্দীর তিরিশ দশকের
প্রথমার্ধের কথা৷ এক মেয়ে বিয়ের পর পরের তিন বছরে পর পর তিনটি
কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়ায় যথারীতি সকলেই তাকে অন্য চোখে দেখতে
শুরু করল৷ তারপর সাত বছর তিনি নীরব হয়ে গিয়েছিলেন৷ এরই মধ্যে
তিন মেয়ের একজন চিরকালের জন্য চলে গেল অনন্ত লোকে৷ এমন সময় তিনি
চতুর্থ বার গর্ভধারণ করলেন৷ দেখতে দেখতে দশ মাস কেটে গেল৷
মেয়েটির মাও তখন ভীষণ অসুস্থ৷ পিঠে বহুমুখী ফোঁড়া, শরীরের
উত্তাপ ১০৫ ডিগ্রির উপর৷ অসুস্থ মায়ের শুশ্রুষায় তাকে গরম সেক
দিচিছলো মেয়েটি, এমন সময় সন্তান আগমনের ব্যথা অনুভব করলে মেয়েটি
প্রবেশ করে চতুর্থবারের মতো অাঁতুর ঘরে৷ কিছুক্ষণ পর ভেসে এলো
নবজাতকের কান্নার আওয়াজ৷ আর সমস্ত অসুখের কথা ভুলে মেয়েটির মা
ছুটলেন অাঁতুর ঘরের দিকে৷ হঠাৎ শুনতে পেলেন তাঁর ভাবীর চিৎকার-
‘মেয়ে হয়েছে, মেয়ে হয়েছে৷’ মুহূর্তেই মায়ের মুখ ম্লান হয়ে গেলো৷
ফিরে চললেন৷ কিন্তু তখনকার দিনের রীতি ছিল ছেলে হলে চিৎকার করে
বলা, মেয়ে হয়েছে...মেয়ে হয়েছে৷ ভাবী তার ননদিনীর অবস্থা বুঝে
বললেন- ‘বুবু, যাবেন না৷ আপনি যা চান তাই হয়েছে৷ ছেলে হয়েছে৷’
তিনি থামলেন৷ ক্ষণিকের জন্য ফিরে তাকালেন৷ দেখলেন তার ভাবী
নবজাতক তুলে ধরেছেন৷ ম্যাজিকের মতো কাজ হলো৷ ১০৫ ডিগ্রি জ্বর
বিনা ওষুধে নেমে গেল ৯৯ ডিগ্রিতে৷ অসম্ভব খুশি হয়ে ছুটে এসে
কোলে তুলে নিলেন তার নাতি, স্বপ্নের পুত্র সন্তানকে৷ আর তাকে
আমৃত্যু হৃদয়ের স্নেহের আসনে অধিষ্ট করেছিলেন৷
তারপর-
আস্তে আস্তে করে সময়টা বদলে গেল, ছেলের চেয়ে বাবা মা মেয়ের উপর
নির্ভরশীল হয়ে পড়লো৷ গত শতাব্দীর শেষ দিকে নানান রাজনৈতিক,
সামাজিক পরিবর্তনের ফলে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে যাচেছ৷ তারা
অনেক বেশি সংসারমুখী হচেছ, সংসারের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসছে৷
পরীক্ষায় উপরের দিকে গড়পড়তায় মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের থেকে বেশি৷
আর মেয়েদের মনে নিজের সংসার অর্থাৎ মা-বাবার সংসার সম্বন্ধে যে
টান, যে দায়িত্ব পালন তা ছেলেদের মধ্যে দেখা যায় না৷ সরকারি বা
বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে, অফিসের উঁচু পদগুলিতে মেয়েরা আস্তে
আস্তে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিচেছ৷
এতসব কিছু হঠাৎ করেই ঘটেনি৷ যত দিন যাচেছ অর্থনৈতিক অবস্থায়
মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে সন্তান সংখ্যা দুইয়ের বেশি বাড়ানো
সম্ভব হচেছ না৷ তা ছেলেই হোক আর মেয়েই হোক৷ কাজেই দু’টি
সন্তানকেই বাবা মা স্বাবলম্বী করে তুলছে৷ পড়াশুনাই আসল লক্ষ্য,
এই বোধ শৈশবেই তাদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচেছ৷ ফলে মেয়েরা
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বেশি অংশ নিচেছ ও প্রথম দিকে থাকছে৷
আগের মতো সাধারণভাবে মেয়েদের পনেরো থেকে একুশের মধ্যেই বিয়ে
হচেছ না৷ তাকে শ্বশুর বাড়ির পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে
চেষ্টা করতে হচেছ না৷ এখন মেয়েদের শিক্ষা জীবন শেষ করার পর বিয়ে
হচেছ৷ পড়ালেখা শেষ করার পর কেউ কেউ চাকরি শুরু করছে৷ এসব যোগ্য
মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ করতে গিয়ে বাবা মাকে বেশ হোঁচট খেতে হচেছ৷
শিক্ষিত চাকরিরত মেয়ের জন্য সঠিক পাত্র পাওয়া বেশ দুরূহ৷ মেয়েরা
এমতাবস্থায় আস্তে আস্তে মা বাপের দায়িত্ব নেবার সাথে সাথে
সংসারের দায়িত্ব নিয়ে ফেলে৷ জীবনের ধর্মকে তো ফেলে দেয়া যায়
না৷ বাবা মা যখন সঠিক উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান করতে করতে
ক্লান্ত, সেক্ষেত্রে মেয়ে নিজেই পাত্র নির্বাচন করে- পিতামাতাকে
অনেকটা চিন্তামুক্ত দায়মুক্ত করে- হাঁপ ছেড়ে বাঁচায়৷ বিয়ের পরও
বাবা মার জন্য এসব মেয়ে কর্তব্য করতে কোনও আপোস করে না৷ আগের
দিনে মেয়েরা যা সহজে পারতো না৷ শিক্ষার অভাব, পারিপার্শ্বিকতার
চাপ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকায় পিতামাতার প্রতি যথেষ্ট টান
বুকেই চেপে রাখতে হতো মেয়েদের৷ এসব মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে আর
একটা আসবাব হয়ে থাকবে এটা যে বা যারা আশা করেন তারা মূর্খের
স্বর্গে বাস করেন৷ আবার গত যুগে ছেলের আগমন পিতামাতার কাছে ছিল
কাঙিক্ষত৷ কারণ বার্ধক্যে ছেলেই ছিল রক্ষক, পালক৷ কিন্তু
একমাত্র আশা আর ভালবাসার সে স্থান যে আস্তে আস্তে মুছে যেতে
থাকলো৷
এ যুগে বিবাহিত ছেলেদের হয়েছে মুশকিল৷ তাকে চাকরিরত স্ত্রীর
ইচছা মেনে নিতে হচেছ৷ বউকে নিয়ে আলাদা ঘর করতে হচেছ, শ্বশুর
বাড়িমুখী হতে হচেছ, বাবা-মার কাঙিক্ষত দায়িত্ব নিতে পারছে না৷
কেননা স্ত্রীর ইচছা না মানলে বিরোধ বাঁধবে, স্ত্রী বাপের বাড়িতে
চলে যাবে৷ তারপর উঠবে বিবাহ বিচেছদের দাবি৷ মেয়ে চাকরিজীবী,
শিক্ষিত, তাই তার দাবি উপেক্ষা করা যায় না৷ দাবি না মানতে পারলে
বিবাহ বিচেছদ৷ তাই ছেলেরা আজকাল এত ঝামেলায় না গিয়ে আলাদা হয়ে
যাচেছ৷ ফলে বাবা-মা তাদের আজন্ম লালিত আশার প্রতিফলন ছেলের মাঝে
দেখতে না পেলে আস্তে আস্তে পুত্র সন্তান পাওয়ার অদম্য ইচছা
ত্যাগ করে কন্যা সন্তানের প্রতি অনুরক্ত হয়ে উঠছে৷
আজ মেয়েরা চাকরি করে অর্থনৈতিকভাবে সচছল৷ তবুও কি নিরাপদ? আজও
বিবাহ বিচেছদের পর নারী পিতার বাড়িতে গেলে যে লাঞ্ছনা তাকে
সহ্য করতে হয় তা কি গ্রহণযোগ্য? আবার একা কোনো মেয়ের ভাড়া বাড়ি
খুঁজতে গেলে শুনতে হয় আপনার হাসবেন্ড কোথায়? আর হাসবেন্ড নামক
প্রাণীটিকে না নিয়ে এলে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে না৷ এত সব কিছুর
পর যদিও বা বাড়ি ভাড়া পাওয়া গেল তখন সমস্ত পাড়ার নজর তার ওপর৷
ঘরে ঘরে চলছে স্বামীদের পাহারা দিয়ে রাখা, কারণ একলা মেয়েকে কি
বিশ্বাস করা যায়?
শিশুকন্যার মুখে নুন দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা, জীবন্ত কবর
দেওয়ার রেওয়াজ আস্তে আস্তে তিরোধান হয়ে নতুন শতকের নতুন সূর্য
উঠছে, কন্যা শিশু তার সঠিক স্থান ফিরে পেতে যাচেছ৷ কিন্তু
মেয়েদের যত উন্নয়ন, অগ্রগতি তা শহরাঞ্চলেই বেশি৷ এখনো কিন্তু
পত্রিকা খুললেই প্রতিদিনই আমাদের চোখে পড়ে নারী নির্যাতনের খবর৷
তাই উন্নয়ন প্রয়োজন তৃণমূল পর্যায়ে৷ আমরা নারীর স্বাধীনতার কথা
বলি৷ নারীর মুক্তির জন্য আন্দোলন করি৷ কিন্তু কতটা পেরেছি?
এদেশে মেয়েদের সুদিন ততদিন আসবে না যতদিন না তারা সচেতন হচেছ৷
এ রীতিকে ভাঙতে এগিয়ে আসতে হবে৷ আসছে আমাদের কন্যা শিশুরা,
যাদের দাবি-
‘সুযোগ চাই বাধা নয়, করব আমি বিশ্ব জয়৷’
|
|