|
|
জন্মের পরই জাহানারা অনেক আদর আর
যত্নে বড় হতে থাকেন৷ কিন্তু ভাগ্য তার জন্যে কোনোদিনই অনুকূল
হয়নি৷ সব প্রতিকূলতাকে জয় করে জাহানারা এখন সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত৷
তিনি একজন অনুকরণীয় নারী হিসেবে এগিয়ে চলেছেন৷ জীবন সংগ্রামে
জয়ী জাহানারার পরিচয়টা জানা যাক৷
টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ভারড়া ইউনিয়নের মিরকুটিয়া গ্রাম৷
গ্রামের বাসিন্দা মো: বিশুমিয়া ও জামেনা খাতুন দম্পতির ছয়
সন্তানের পঞ্চম জাহানারা খাতুন৷ তার জন্ম ১৯৬২ সালে৷ জন্মের
প্রথম কয়েক বছর আনন্দেই কাটে৷ বিশু মিয়া চেয়েছিলেন, তার ছোট
মেয়ে বড় হয়ে যেন সমাজে একজন গুণী নারী হতে পারেন৷ তাই ছোট থেকে
বাবা ছিলেন মেয়ের পড়াশুনার দিকে বিশেষ যত্নশীল৷ দ্বিতীয়
শ্রেণিতে পড়াকালে মারা গেলেন বাবা বিশু মিয়া৷ জাহানারা বলেন,
বাবার মৃত্যুর পরই লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি সন্দিহান হয়ে পড়ি৷
কিন্তু বড় ভাইদের সাহায্যে পড়াশুনা চালিয়ে যাই৷ শুরু হয় ১৯৭১
সালের মুক্তিযুদ্ধ৷ বড় ভাই মো: মোকসেদ আলী যুদ্ধে যান৷ ১৯৭৪
সালে ভাইয়ের মৃত্যুর ফলে আবার বাধাগ্রস্ত হয় জাহানারার লেখাপড়া৷
জাহানারার ইচছা ছিল, বড় হয়ে তিনি একজন আইনজীবী অথবা
ম্যাজিস্ট্রেট হবেন৷ কিন্তু নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৭৬ সালে
বাবনাপাড়ার আব্দুর রহমান খানের সাথে তার বিয়ে হয়৷ শুরু হয় ২০
সদস্যের পরিবারে ছোট বউ হিসাবে সংসারজীবন৷ স্বামীর সংসারে এসেও
তিনি বসে থাকেননি৷ পরিবারে সবার বাধার মুখে শ্বশুর ও স্বামীর
অনুমতি নিয়ে ভর্তি হন নাগরপুরে স্কুলে৷ কিন্তু সংসারের কাজকর্ম
করে আর পড়াশুনা করা হয় না জাহানারার৷ তবু পরীক্ষার সময়
শিক্ষকদের আগ্রহে ফরম পূরণ করেন এবং পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে ১৯৭৯
সালে এসএসসি পাশ করেন৷ এখানেই থেমে থাকেনি৷ তিনি শ্বশুরের
অনুপ্রেরণায় অনেক বাধা অতিক্রম করে ১৯৮১ সালে এইচএসসি পাশ করেন৷
এবার জাহানারা একটি চাকরি পেতে চেষ্টা শুরু করেন৷ কিন্তু সংসারে
নতুন আরো ঝামেলা তৈরি হয়৷ ১৯৭৬ সালে বিয়ে হবার ছয় বছরেও
জাহানারা মা হতে পারেননি৷ তার উপর খানবাড়ির বউ চাকরি করবেন৷
এবার স্বামীও তার বিপরীতে অবস্থান নেন৷ জাহানারা হাল ছাড়েননি৷
তার শেষ আশা তার শ্বশুর মো: আজহার আলী৷ শ্বশুরের অনুমতি নিয়ে
জাহানারা শুরু করেন বিআরডিবি (ইধহমষধফবংয জঁৎধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ
ইড়ধৎফ) অর্গানাইজার পদে চাকরি৷ এই চাকরি ১৯৯২ সালে শুরু করেন৷
জাহানারা ১৯৯৭ সালে বিপুল ভোটে এলাকার সংরক্ষিত মহিলা আসনে ইউপি
সদস্য নির্বাচিত হন৷ এরই মধ্যে সমন্বয়কারী সাজেদা বেগমের
অনুপ্রেরণায় ২০০০ সালে নাগরপুর উপজেলা পরিষদ মিলানায়নে
অনুষ্ঠিত ৭৮তম ব্যাচে উজ্জীবক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন এবং
সফল্যের সাথে তা শেষ করেন৷ সে সময়ে সেখানে বিভিন্ন ইউনিয়নের
চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সুধীজনরা অংশগ্রহণ করেন৷
জাহানারা বেগম প্রশিক্ষণ বিষয়ে তার অনুভূতি প্রকাশ করেন এইভাবে,
‘সেই সময়ের আলোচনায় জ্ঞানের রাজ্য, যোগাযোগ ও নারীর ক্ষমতায়ন
আমার খুব ভালো লেগেছিল৷ এই তিনটি আলোচনার মধ্যে দিয়ে জাতির
করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল৷ যা মানুষের পরিবর্তনের জন্য
অবশ্যই দরকারি৷’ সেই থেকে জাহানারার জীবনের লক্ষ্য সমাজের
পরিবর্তন এবং দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ায়েছেন৷ ইতিমধ্যে তিনি
তার এলাকায় মেম্বার হিসাবে মানুষের পাশে দাঁড়ান৷ ২০০২ সালের
মেয়াদ শেষে ২০০৩ সালের নির্বাচনে তিনি আর প্রার্থী হননি৷ এই
বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের
কার্যক্রমে ব্যাপক স্বচছতার অভাব রয়েছে৷ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তকে
সহায়তা করা কঠিন৷ তাই আর দ্বিতীয়বার নির্বাচন করেননি৷ এর মধ্যে
২০০১ সালে তিনি জড়িয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে৷
২০০৭ সালে জাহানারা আবার নির্বাচিত হন নারীনেত্রী প্রশিক্ষণের
জন্য৷ তিনি বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ
ফাউন্ডেশন কোর্স’-এর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷ প্রশিক্ষণের পরে
তিনি নিয়মিত ফলোআপে অংশগ্রহণ করেন৷ এখনো তার পারিবারিক কিছু
প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তবু জাহানারা এগিয়ে চলেছেন দুর্বার গতিতে৷
এই প্রশিক্ষণ নিয়ে কথা উঠতেই তিনি বলেন ‘আগে আমি নানা বয়সের
নারীদের সাথে সব কথা বলতে পারতাম না৷ সংকোচ বোধ হতো, এরা মেয়ে
ও নাতনীর বয়সী; তাদের সাথে সব কথা বলা যায় না৷ প্রশিক্ষণটি
আমার এই ভুলটি ভেঙে দিয়েছেন, আমি প্রতিটি বিষয়ে গভীরভাবে জানতে
পারছি এবং সবার সাথে শেয়ার করে তাদের সহযোগিতা করতে পারছি৷’
জাহানারা জনগণের অবস্থার উন্নয়নের জন্য তার বর্তমান অবস্থান
নাগরপুর ইউনিয়নের বাবনাপাড়া গ্রামে অবস্থান করে কাজ করছেন৷ তার
কাজগুলোর মধ্যে কর্মশালা, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ,
জন্মনিবন্ধন, নারীনির্যাতন, স্যানিটেশন নিয়ে উঠান-বৈঠক করে
যাচেছন৷ এছাড়া জাতীয় কন্যাশিশু, আন্তর্জাতিক নারীদিবসসহ সকল
জাতীয় দিবসগুলো পালন করে যাচেছন৷ তিনি তার কাজের সহযোগিতার
জন্য নতুন নতুন উজ্জীবক এবং নারীনেত্রী তৈরিসহ সহযোগিতা করছেন৷
ইতিমধ্যে তিনি পঞ্চম ব্যাচে স্বেচছাব্রতী প্রশিক্ষক হিসাবে
প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন৷ তিনি গড়ে তুলেছেন ‘আশার প্রদীপ’ নামে
একটি নারী সংগঠন৷ এছাড়াও জাহানারা পরিবেশ রক্ষার্থে গ্রামের
মহিলাদের সাথে কাজ করছেন৷ তিনি নিজের বাড়িতে ব্যাপক সংখ্যায় ফল
ও কাঠগাছ লাগিয়েছেন৷ তিনি অন্যদের উদ্বুদ্ধ করছেন এবং কখনো কখনো
নিজে চারা দিয়ে তাদের গাছ লাগানোর প্রেরণা দিচেছন৷
বর্তমানে জাহানারা উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব
পালন করছেন৷ তিনি মনে করেন, স্থানীয় সরকারই পারে মানুষের
উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে৷ বর্তমানে তিনি ইউপি
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচেছন৷
জাহানারা খাতুনের মতো যদি সবাই সংগ্রামী হতেন, তবে আমাদের
দেশের সমাজ অনেক আগেই বদলে যেত৷ তাই সবার প্রতি অনুরোধ, আসুন
দেশ গঠনে আবারও দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ শুরু করি৷ আমরা একদিন সফল
হবই৷
|
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |