General Publications

 
Search  ...a  page
Main Links
 
standing Committee of Forum
 
 

 

কন্যাশিশুর অধিকার: প্রসঙ্গ বাংলাদেশ

ইভটিজিং : চাই সামাজিক প্রতিরোধ

একটি মুখের হাসির জন্য

আদিবাসী সমাজে নারী ও উন্নয়ন পরিকল্পনা

নারীর মানবাধিকার-রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

ভাঙা-গড়ায় নূরুন্নাহার

নারী মুক্তির অগ্রদূত বেগম রোকেয়া

ইভটিজিং-একটি সামাজিক ব্যাধি

 
 

কন্যাশিশু- ৪

ইভটিজিং-একটি সামাজিক ব্যাধি
নাসরিন ইসলাম লোপা*

 


একটি সুন্দর সমাজ সবারই কাম্য ছিল, আছে এবং থাকবে৷ যেখানে সবার অধিকার হবে সমান৷ সবার জন্য থাকবে সমান সুযোগ, সমান সুবিধা৷ যে কোনও সামাজিক সমস্যার দ্রুত সমাধান সবাই মিলেই করবে, এমন একটি সমাজের স্বপ্ন তো সবারই৷ কিন্তু সেই স্বপ্ন যেন সুদূরপরাহত! আমাদের বাস্তবতা এসব অমলিন স্বপ্নকে পারমিট করে না৷ বরং আমাদের নিত্যসঙ্গী রূঢ় বাস্তবতা আরও কত রূঢ় হবে, আরও কত কদর্য হবে সেই ফর্দই আঁকেন প্রতি মুহূর্তে৷ বিশেষ করে আমাদের মতো অ-বলা না-বলা কন্যারা, যারা একটু উড়ার স্বপ্ন দেখি, একটু ঘোরার স্বপ্ন আঁকি, তাদের জন্য বাস্তবতার এসব উটকো হ্যাপা সামলাতে হয় প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তেই৷ এমনই একটি উটকো হ্যাপা ইভ টিজিং৷

ইভ টিজিং শব্দটা শুনতে যত মধুর লাগে, এর মানেটা কিন্তু ততই কদর্য৷ বরং যারা এর শিকার হন, হয়েছেন বা হবেন তাদের কাছে এটা ততটাই বিভিষিকাময় ও তিক্ততায় ভরা৷ অথচ এমন একটা গা ঘিনঘিনে ব্যাপারটির শিকার বুঝি সব কালের সব মেয়েই৷ তবে বাংলাদেশে এ অপসংস্কৃতি স্বাধীনতা-উত্তর সমাজেই বেশি করে ডালপালা মেলে৷ যে কারণে আজকাল রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজের ফটক, পাড়ার মোড়, চায়ের দোকান কিংবা চলতি পথেও ইভটিজার বা উত্ত্যক্তকারীদের দেখা মিলে৷ এসব স্থানে কিছু উড়ো বাজে মন্তব্য এসে আপনার স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে, দিতে পারে সারা দিনের জন্য আপনার মনটাকে বিষিয়ে৷

কাজটি খুব নিখুঁতভাবেই করে সমাজের বখে যাওয়া ছেলে-ছোকরারা৷ অনেক সময় বয়স্করাও নির্দ্বিধায় কাজটি করে ফেলেন মেয়ের বয়সী, মায়ের বয়সী মেয়েদের সাথে৷ এবং তারা এটা করে নানান অভিনব ভঙ্গিতে৷ তাই মাঝে মাঝে ধারণা হয়, রাস্তার এসব রোমিওর সারা দিনের কাজই বুঝি কোন মেয়েটাকে কীভাবে যন্ত্রণা দিবে তারই ছক কষা৷ অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে মেয়েদেরকে এভাবে রাস্তাঘাটে বিরক্ত করার ব্যাপারটি যেন সাধারণ এক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে৷ সাধারণত ১০ থেকে ১৫/১৬ বছর বয়সী স্কুল গোয়িং মেয়েরাই এর প্রধান শিকার৷ কিন্তু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরাও এর থেকে রেহাই পায় না৷ শুধু কি তাই, যে কোনও বয়সী নারীই এর শিকার হয়ে যেতে পারেন যে কোনও মুহূর্তে৷ আর ইভ টিজার বা উত্ত্যক্তকারীরাও হতে পারে যে কোনও বয়সের ছেলে বা পুরুষ৷

তবে মেয়েরা রাস্তাঘাটে কেন ছেলেদের দ্বারা উত্ত্যক্ত হয় কিংবা উল্টো করে যদি বলি ছেলেরা কেন মেয়েদেরকে উত্ত্যক্ত বা বিরক্ত করে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয়া একটু মুশকিলই৷ তবে মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি এক ধরনের মানসিক বিকারগ্রস্ততা৷ স্থান- কাল-পাত্র ভেদে উত্ত্যক্ততার কারণে ভিন্নতা রয়েছে৷ যেমন, কখনও কখনও দেখা যায় যদি কোনও ছেলে কোনও মেয়েকে পছন্দ করে কিংবা প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হয় তখন ওই মেয়ের প্রতি তার এক ধরনের আক্রোশ জন্মায়৷ যার ফলে ছেলেটি একা বা দলবল নিয়ে রাস্তাঘাটে মেয়েটিকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে মনের ঝাল মেটায়৷ এটি একটি সাধারণ কারণ ও প্রচলিত ঘটনা৷ এছাড়াও কখনো কখনো দেখা যায় পারিবারিক দ্বন্দ্ব, কলহ, সমবয়সীদের সাথে ঝগড়া, বিবাদ, কখনো কখনো বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেও ছেলেরা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করতে প্রবল বিক্রম নিয়ে এগিয়ে আসে৷ কখনো বা অভ্যাসবশতও নিয়মিত এমন করে থাকে৷

কারণ যাই হোক এ ধরনের আচরণ কারো জন্যই মঙ্গলজনক নয়, এটা কি আমরা মনে রাখি? রাখি না বলেই এর ভয়াবহ সব প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আমাদের সমাজে৷ যার মোক্ষম শিকার আমাদের মেয়েরাই৷ টিজারদের টিজিং সইতে না পেরে অনেক মেয়েই গলায় দড়ি দিচেছ, বিষ খাচেছ এবং স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়া বন্ধ করে ঘরে দোর দিয়ে বোবা কান্নায় মরে যাচেছ৷ এ ধরনের ঘটনা তো কোনোভাবেই প্রত্যাশিত বা গ্রহণযোগ্য নয়৷ অথচ এমন ঘটনা ঘটেই চলছে৷

এতো গেল মেয়েদের উপর উত্ত্যক্ততার বড় প্রভাবের কথা৷ কিন্তু যে কোনও উত্ত্যক্ত হওয়ার ঘটনাতেই মেয়েরা মুষড়ে পড়ে, ভীতসন্ত্রস্ত হয়৷ ভেঙ্গে পড়ে মানসিকভাবে৷ নিজেকে ভীষণ একা, অসহায় আর অনিরাপদ মনে হয় তার৷ এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে সে নিয়তই পরিত্রাণ চায়৷ কিন্তু আমাদের সমাজ যেহেতু পুরুষ শাসিত তাই এ থেকে পরিত্রাণ মেলা ভার৷ শুধু তাই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে উত্ত্যক্তকারীরা এতটাই প্রভাবশালী হয় যে সমাজের কেউ তাদের কিছু বলতেই পারে না৷ কিছু করা তো দূরের বিষয়৷ তাই দুরাচারীরা অবলীলায় এসব অনাচার করেও রেহাই পেয়ে যায়৷ তাছাড়া মেয়েটির পরিবারও এর কোনো সমাধান দিতে পারে না৷ কারণ মেয়েটিকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখা বা তাকে রক্ষা করার জন্য সারাক্ষণ তার পাশে থাকা সম্ভব নয়৷ তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর প্রতিকার হিসেবে পরিবার থেকে প্রায়ই ব্যবস্থাপত্র আসে লেখাপড়া বন্ধ করে দেয়ার, দ্রুত বিয়ে দিয়ে ঝামেলা এড়ানোর কিংবা বাইরের সব কাজ বন্ধ করে ঘরে দোর দিয়ে বসে থাকার৷

কিন্তু সত্যিকার অর্থে এটা কোনো সমাধানই নয়৷ তাই এ ধরনের ব্যবস্থাপত্র মেয়েরা মেনে নিতে পারে না৷ কারণ অনেক মেয়েই ঘরে বসে থাকতে পছন্দ করে না৷ অথবা তারা চায় না যে লেখাপড়া মাঝপথে ছেড়ে দিতে৷ এ রকম ক্ষেত্রে মেয়েরা নানান জটিল মানসিক সঙ্কটে ভোগে৷ অশান্তি আর জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তাদের মধ্যে দেখা দেয় আত্মহত্যার প্রবণতা৷ অথচ যার কারণে তার এই অবস্থা সেই উত্ত্যক্তকারী কোনও শাস্তি তো পায়ই না, বরং ব্যাপারটি প্রতিকারহীন জেনে নিষপাপ মেয়েটিই তার সম্ভাবনাময় সুন্দর জীবনের ইতি টানে অবশেষে ৷

এমন নির্মম ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় উত্ত্যক্ত করা বা ইভ টিজিং সাধারণ কোনও ক্ষত নয়, বরং এটি একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি৷ এমনই ব্যাধি যা ধীরে ধীরে সমাজকে গ্রাস করে নিচেছ৷ আর এখনই প্রতিরোধ না করলে এই ব্যাধির প্রকোপে সমাজ জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে৷ ইদানিং যার নজির আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেকটাই বেড়ে যাওয়া থেকে৷ এটা আমাদের জন্য একটি ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়৷

আমরা সকলেই একটি সুশৃঙখল শান্তিপূর্ণ সমাজ জীবন কামনা করি৷ আর এজন্য এ ধরনের মারাত্মক ব্যাধির আশু প্রতিকার প্রয়োজন৷ তাই এ ব্যাপারে সবার আগে প্রয়োজন গণসচেতনতা৷ প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগের৷ এ ধরনের ব্যাধি প্রতিকারে আইনি ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন৷ শক্ত আইন ও তার কঠোর প্রয়োগই করতে পারে এমন ব্যাধির সমূল উৎপাটন৷ কিছু উত্ত্যক্তকারী বা ইভ টিজারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, অন্যদের এ ধরনের অপরাধমূলক আচরণে আর উৎসাহিত করবে না৷ উত্ত্যক্ততা প্রতিরোধের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচেছ মেয়েদেরকে আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে বের করে আনতে হবে৷ তাদের জীবনের মূল্য বুঝাতে হবে৷ এছাড়া আমরাও এ ব্যাপারে বেশ কিছু ভূমিকা নিতে পারি৷ যেমন, যেসব ছেলেরা লেখাপড়ার সাথে জড়িত না তাদেরকে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে লাগাতে পারি৷ আবার যেসব ছেলেরা স্কুল কলেজ থেকে ফিরে রাস্তায় বসে আড্ডা দেয়, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে তাদের জন্য এলাকায় কোনও ফুটবল বা ক্রিকেট ক্লাবের ব্যবস্থা বা অন্য কোনও বিনোদনের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে৷

একটি সুন্দর সুশৃঙখল সমাজ গড়ার দায়িত্ব সবারই৷ ইভ টিজিং এর মতো একটি গুরুতর সামাজিক ব্যাধি নিরাময়ে আমি আপনিসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে আন্তরিকতা নিয়ে৷ তাহলেই সমাজ থেকে এই ভয়াবহ ব্যাধি দূর করা সম্ভব হবে৷ এর জন্য প্রয়োজন শুধু সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের৷
 

 

 

     

National Girl Child Advocacy Forum

Contact Us

3/7 Asad Avenue Mohammodpur, Dhaka-1207

Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975, Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net