General Publications

 
Search  ...a  page
Main Links
 
standing Committee of Forum
 
নারীর কথা-৪

 

Main Links
 
standing Committee of Forum
 
নারীর কথা-৪

 

সম্পাদকীয়

নারী নির্যাতনের স্বরূপ ও আমাদের বিবেক

যে কথা যায় না বলা

আলোকিত আরতি
আসমা ও তার নারী কল্যাণ সংস্থা
আঁধারে আশার প্রদীপ
আত্মবিশ্বাসী দোলনা
আনোয়ারার সংগ্রাম চলছে
এলাচি কথন
এক নিরলস নারী সংগঠক
এক স্বাবলম্বী নারীর একান্ত কথা
এখন তিনি এলাকার সফল নেত্রী
কিশোরগঞ্জের শিখা: এক লড়াকু সংগ্রামী
জীবন সংগ্রামে জয়ী জাহানারা
জেসমিনের স্বপ্ন: আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ
দৃঢ় প্রত্যয়ী নাসিমা
রামুর নারী উন্নয়নের প্রতীক
লুৎফা: এক অনুপ্রেরণার নাম
সাজেদা মেম্বার হতে চায়
সাঈদা: অসহায় মানুষের পাশে
সব বাধাই হার মানলো
সাহস করেই স্বপ্ন দেখি
বাঘিয়ার বাহারজান
নকশিকাঁথা: জীবনের রঙিন ফোঁড়

ইভানের কথা

 

আত্মবিশ্বাসী দোলনা
নীলুফার ইয়াসমীন নীলু

  ৪৫ বছরের একজন নারী৷ যার চোখে মুখে বার্ধক্যের ছাপের চেয়ে বেশি ছাপ পড়েছে তেজস্বিনীর তেজের আভা৷ বাজিগরের মতো জীবনযুদ্ধের প্রতিটি যুদ্ধে হারতে হারতে যে নারী জয়ী হয়েছেন৷ শৈশবে প্রতিটি মানুষই স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক কিংবা আরো অনেক কিছু হওয়ার৷ আকাশছোঁয়া সব স্বপ্ন৷ শৈশবে তেমনি স্বপ্ন দেখতেন করিমগঞ্জ থানার ক্ষুদির জংগল গ্রামের মো: আ: গনি সরকার ও ফুলেন্নেসা বেগমের ছয় সন্তানের মধ্যে পঞ্চম সন্তান দোলনা আক্তার৷ স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে নার্স হবেন৷ অসুস্থ মানুষের সেবা করবেন৷ খুব অল্প সংখ্যক মেয়েশিশুই তাদের কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে৷ আর বাকি সবাই সুবিধাবঞ্চিত নারী হিসেবে বেড়ে ওঠে৷ স্বপ্নগুলো তখন বাল্যবিবাহ নামক হিংস্র পশুর থাবায় ক্ষতবিক্ষত৷ তেমনি একজন নারী দোলনা৷ যে নারীর স্বপ্নগুলো অংকুরিত হওয়ার আগেই মিশে গেছে মাটির সাথে৷

দোলনার জন্ম একটি অসচছল পরিবারে৷ বাবা তেমন কিছুই করতেন না৷ ছয় সন্তানের মুখে তিন বেলা খাবার দিতে হিমসিম খেতেন পিতা মো: আ: গনি সরকার৷ তার উপর ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া৷ কৃতিত্বের সাথে প্রাইমারি পাশ করে করিমগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলেন দোলনা৷ ছোট্টমেয়ের ছোট্ট মনে প্রতিবেশীদের জন্য অফুরন্ত মায়া৷ কারো কষ্ট দেখলে আকুল হয়ে কাঁদতেন দোলনা৷ এগিয়ে যেতেন একটু সহযোগিতা করার আশায়৷ এভাবেই কেটে গেল দুটো বছর৷

অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত হলেন দোলনা৷ বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকলো বাড়িতে৷ বাবা-মা দোলনার লেখাপড়া বন্ধ করে দিলেন৷ করিমগঞ্জ থানার কাদির জংগল ইউনিয়নের জংগলবাড়ীর ইসলামপাড়া গ্রামের মো: ফয়জুদ্দিনের বড় ছেলে মুদি দোকানদার মো: শামসুদ্দিনের সাথে তার বিয়ে দিলেন৷ পাত্র এসএসসি পাশ, বিপত্মীক ও এক কন্যা সন্তানের জনক৷ যৌতুক হিসাবে পাত্রকে দশ হাজার টাকা দেওয়া হয়৷ বিয়ের রাতে ঘুম ঘুম চোখে কিশোরী দোলনা দেখলেন, তিনি শুধু আজ একজনের বৌ নন, তিনি একটি কন্যা সন্তানের মা’ও বটে৷ ঘরের বড় বৌ হওয়ায় প্রায় সব ধরনের দায়িত্ব দোলনার উপরে পড়লো৷ ছোটবেলা থেকেই বাবার বাড়িতে দেখে এসেছেন অভাব আর অভাব৷ স্বামীর সংসারে এসে আরো কঠিন অভাবের মুখে পতিত হলেন তিনি৷ নেত্রকোনা বাজারে ছোট্ট একটি মুদি দোকান ছিল তার স্বামীর৷ দোকানের আয় দিয়ে মাসে পনের দিনও চলতো না৷ অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটতে লাগলো৷

বিয়ের এক বছরের মধ্যে দোলনা অনুভব করলেন, তিনি মা হতে চলেছেন৷ তার শরীরে অন্য এক মানুষের উপস্থিতি৷ নয় মাস পর দোলনা জন্ম দিলেন একটি কন্যা সন্তানের৷ আদর করে মেয়ের নাম রাখলেন রানী৷ কিন্তু তার জন্য তো চাই অন্ন-বস্ত্র আর বাসস্থানের৷ বাসস্থানের প্রয়োজন মেটাতে পারলেও অন্ন-বস্ত্রের যোগান দোলনা দেবেন কোথা থেকে! নিজেদেরই তো পেটে খাবার জোটে না৷ লোকসান হওয়ায় দোকানটা ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে কোনো চাকরি করার পরামর্শ দিলেন দোলনা তার স্বামীকে৷ যেহেতু এসএসসি পাশ করেছেন দোলনার স্বামী, সেহেতু ছোটখাট কোনো চাকরি পেতেও পারেন সেই আকাঙক্ষায় ঢাকা যেতে রাজী হলেন দোলনার স্বামী৷ ঢাকা যাওয়ার সময় দোলনা বেগম তার স্বামীকে বলেছিলেন যে, ‘তোমার ভাগ্যের চাকা কেউ এসে ঘুরিয়ে দেবে না৷ তোমার ভাগ্যের চাকা তোমাকেই ঘুরাতে হবে৷’ দোলনার এ কথা দোলনার স্বামী জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মনে রেখেছিলেন৷ কিন্তু প্রবাদ আছে, অভাগা যে দিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায়৷ দোলনার স্বামীও ঢাকায় এসে কোনো চাকরি না পেয়ে হতাশার সাগরে যেন তলিয়ে যাচিছলেন৷ এদিকে দোলনার কানে, গলায়, হাতে যেটুকু স্বর্ণালংকার ছিল, তা বিক্রি করে মাত্র এক হাজার টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন দোলনার স্বামী৷ ইতিমধ্যে প্রায় ছয়শত টাকা খরচ হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই৷

একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন দোলনার স্বামী কোনো একটা কাজের আশায়৷ দেখতে পেলেন, কিছু লোক রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসে নানা রকম জিনিসপত্র বিক্রি করছে৷ তখন দোলনার স্বামী তিনশত টাকার জুতা কিনে বসে পড়লেন ফুটপাতে৷ এতে নাম মাত্র টাকা লাভ হলো৷ সে টাকা দিয়ে আবার জুতা-স্যান্ডেল কিনে ফুটপাতে বসে বিক্রি করলেন৷ এভাবে দিন যেতে লাগলো, সাথে টাকার পরিমাণও বাড়তে থাকলো৷ কিছুদিন পর দোলনার স্বামী ফুটপাতে একটি দোকান দিলেন৷ আয় রোজগার ভালোই হতে থাকলো৷ দু মেয়েসহ দোলনাকে তার স্বামী ঢাকায় নিয়ে এলেন৷ ওদের তখন আর না খেয়ে থাকার মতো অবস্থা ছিল না৷ সংসারে মোটামুটিভাবে সচছলতা ফিরে এলো৷ আর ধীরে ধীরে উন্নতি হতে লাগলো দোলনার স্বামীর ব্যবসায়৷ একে একে পাঁচটি কন্যা সন্তানের মা হলেন দোলনা৷ ইতোমধ্যে দোলনার স্বামী ফুটপাত ছেড়ে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের দ্বিতীয়তলায় রানী সুজ নামে একটি পাইকারি জুতার দোকান দিলেন৷

বস্তির ঘর ছেড়ে ভাড়া নিলেন একটা ফ্ল্যাট৷ সুখে দিন কাটছিল দোলনার৷ ১৭ বছর বয়সে বড় মেয়েকে বিয়ে দিলেন৷ বড় মেয়েটি সুন্দরী হওয়ায় বাজারের মধ্য দিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় বখাটে ছেলেরা তাকে বিরক্ত করতো৷ তাই মান-সম্মান যাওয়ার ভয়ে অল্প বয়সেই মেয়েকে পঁচিশ হাজার টাকা যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলেন৷ এরপর দ্বিতীয় মেয়েটির পালা৷ তাকেও একই কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বোনের ছেলের সাথে বিয়ে দিলেন৷ বিয়েতে রঙিন টিভিসহ ফার্ণিচার দিলেন যৌতুক হিসাবে৷ সবার কপালে নাকি সুখ বেশিদিন সয় না৷ ৬ষ্ঠ সন্তান জন্মদানের জন্য দোলনা ঢাকা থেকে শ্বশুরবাড়ি এলেন৷ এবার একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দিলেন৷

দোলনাকে নিজ পৈতৃক বাড়িতে রেখে দোলনার স্বামী চলে গেলেন ঢাকায়৷ ঢাকা যাওয়ার পথে স্বামী অজ্ঞানপাটির কবলে পরে জ্ঞান হারান৷ পরে তার চিকিৎসা করে লাভ হয়নি৷ দোলনার স্বামী মারা যান৷ দোলনা তার সর্বস্ব বিক্রি করেও তাকে বাঁচাতে পারলেন না৷ স্বামীর হঠাৎ মৃত্যুতে দিশাহারা হয়ে পড়লেন তিনি৷ চার মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে কী করে চলবেন তিনি৷ তিন রুমের একটা টিনশেড দালান ছাড়া একটা টাকাও তার স্বামী রেখে যেতে পারেননি৷ মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় চলতে থাকলো দোলনার সংসার৷ এতে করে একবেলা খাবার থাকে তো দুই দিন ঘরে খাবার থাকে না৷ এভাবে চলতে ভালো লাগছিলো না৷ নিজ ভাগ্য নিজেকেই গড়তে হবে৷ কিন্তু কী ভাবে? কোথা থেকে শুরু করবেন ঠিক বুঝতে পারছিলেন না দোলনা৷ এ দিকে দু মেয়ে সাথী ও রনি কৃতিত্বের সাথে অষ্টম শ্রেণিতে উঠল; কিন্তু লেখাপড়ার খরচ না দিতে পারায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিল৷ স্কুল থেকে শিক্ষকরা সাথী রনির লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেন৷ আবার তারা স্কুলে যেতে শুরু করল৷

এসএসসি পরীক্ষায় সাথী, রনি ভালো করলো৷ একদিন সাংবাদিক সাদেক আহম্মেদ স্বপনের কাছে দোলনা উজ্জীবক প্রশিক্ষণের কথা জানতে পারলেন৷ এবং মেয়ে সাথীকে নিয়ে ২০০৫ সালের ১৩-১৬ আগস্ট উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ৭৩৫তম ব্যাচে উজ্জীবক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷ উজ্জীবক প্রশিক্ষণে নারীর ক্ষমতায়ন আলোচনাটি শুনতে শুনতে কেঁদেছেন অনেকবার৷ দোলনা দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ও উজ্জীবক প্রশিক্ষকদের কাছে চির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন যে, আমাদের দেশের প্রতিটি নারীর এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা প্রয়োজন৷ তা হলে আর নারীদের কারো বোঝা হয়ে থাকতে হবে না৷ নারীরা সংসার ধর্মের পাশাপাশি ঘরে বসেই কিছু না কিছু আয় করতে পারবেন এবং সংসারে নিজের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি ও নিজের একটি মত প্রকাশের অধিকার পাবেন৷

উজ্জীবক প্রশিক্ষণ নেয়ার পর দোলনা করিমগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা চন্দ্রা সরকারের নেতৃত্বে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম ‘অগ্রদূত মহিলা সমবায় সমিতি’৷ এ সমিতিতে ৩০ জন মহিলা সদস্য আছে৷ এরা সবাই মাসে ৫০ টাকা করে সঞ্চয় করে৷ এ সমিতির মাধ্যমে দুস্থ মহিলাদের টেইলারিং ও হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ দিয়ে সমিতিতেই অর্ডারি কাজ করানো হতো৷ দোলনা অগ্রদূত মহিলা সমবায় সমিতি থেকে দু হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সাথী ও রনিকে কলেজে ভর্তি করালেন৷ কলেজেও সাথী, রনি শিক্ষকদের সহযোগিতায় লেখা-পড়া করতে লাগলো৷ দোলনা যখন রান্না করতে যেতেন তখন প্রতিবার রান্নার চাউল থেকে এক মুষ্ঠি চাউল উঠিয়ে রাখতেন৷ এভাবে মাসে তার প্রায় তিন/চার কেজি চাউল জমা হতো৷ সেই চাউল বিক্রি করে প্রতিমাসে একটি করে মুরগি কিনতেন৷ এভাবে ৫/৬টি মুরগি হলো দোলনার৷ মুরগিগুলোকে নিজের সন্তানদের মতো করেই যত্ন করতেন৷ বাড়ির আশেপাশে খালি জায়গা ছিল না৷ যতোটুকু ছিল, সেখানে লাউ, সিম, বরবটি, পুঁইশাকের গাছ লাগিয়ে লতাগুলো উঠিয়ে দিতেন টিনের চালের উপর৷ ভালোই ফলন হতো৷ আর যা ফলতো তা থেকে নিজের চাহিদা মিটিয়েও বাড়ির আশে-পাশের মহিলাদের কাছে বিক্রি করতেন দোলনা৷ ফলে সংসারে কিছুটা সচছলতা ফিরে এসেছিল৷

সাথী ও রনি কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করে৷ পাশ করার পর ইউনিলিভার- এ চাকরি হলো৷ দু’ বোনের মোট মাসিক বেতন হলো পনেরো হাজার টাকা৷ আর মুরগির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২৫টি হলো৷ প্রতিদিন মুরগির ডিম দিয়ে নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও ২/৩ হালি ডিম বিক্রি করেন দোলনা৷ ছোট দুমেয়ে ও এক ছেলে স্কুলে পড়ে৷ তার সংসারে অভাব নেই বললেই চলে৷ দোলনা ঘৃণা করেন যৌতুক প্রথাকে৷ সাথী ও রনীকে বিয়ে দিয়েছেন যৌতুক ছাড়াই৷

দোলনা সেবিকার সনদপত্র না পেলেও আজ একজন অভিজ্ঞ ধাত্রী৷ শুধু ধাত্রী হিসেবে নয়, একজন মমতাময়ী নারী হিসেবেও তিনি সকলের কাছে পরিচিত৷ তিনি নিজের খাবার তুলে দেন অনাহারীর মুখে৷ কারো উপকার করতে পারলেই যেন দোলনা মনে শান্তি পান৷ নারীদিবস ও কন্যাশিশু দিবসে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন৷ আর প্রায়ই মনে মনে উচচারণ করেন, আত্মশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তি কখনোই দরিদ্র থাকতে পারে না৷

 

 
 

National Girl Child Advocacy Forum

 

Contact Us

3/7 Asad Avenue Mohammodpur, Dhaka-1207

Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975, Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net