| Main Links |
| |
|
standing Committee of Forum |
| |
|
নারীর কথা-৪ |
| Main Links |
| |
|
standing Committee of Forum |
| |
|
নারীর কথা-৪ |
|
|
|
|
|
আত্মবিশ্বাসী দোলনা
নীলুফার ইয়াসমীন নীলু |
|
|
৪৫ বছরের একজন নারী৷ যার চোখে মুখে
বার্ধক্যের ছাপের চেয়ে বেশি ছাপ পড়েছে তেজস্বিনীর তেজের আভা৷
বাজিগরের মতো জীবনযুদ্ধের প্রতিটি যুদ্ধে হারতে হারতে যে নারী
জয়ী হয়েছেন৷ শৈশবে প্রতিটি মানুষই স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে ডাক্তার,
প্রকৌশলী, শিক্ষক কিংবা আরো অনেক কিছু হওয়ার৷ আকাশছোঁয়া সব
স্বপ্ন৷ শৈশবে তেমনি স্বপ্ন দেখতেন করিমগঞ্জ থানার ক্ষুদির
জংগল গ্রামের মো: আ: গনি সরকার ও ফুলেন্নেসা বেগমের ছয়
সন্তানের মধ্যে পঞ্চম সন্তান দোলনা আক্তার৷ স্বপ্ন দেখতেন বড়
হয়ে নার্স হবেন৷ অসুস্থ মানুষের সেবা করবেন৷ খুব অল্প সংখ্যক
মেয়েশিশুই তাদের কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে৷ আর বাকি সবাই
সুবিধাবঞ্চিত নারী হিসেবে বেড়ে ওঠে৷ স্বপ্নগুলো তখন বাল্যবিবাহ
নামক হিংস্র পশুর থাবায় ক্ষতবিক্ষত৷ তেমনি একজন নারী দোলনা৷ যে
নারীর স্বপ্নগুলো অংকুরিত হওয়ার আগেই মিশে গেছে মাটির সাথে৷
দোলনার জন্ম একটি অসচছল পরিবারে৷ বাবা তেমন কিছুই করতেন না৷ ছয়
সন্তানের মুখে তিন বেলা খাবার দিতে হিমসিম খেতেন পিতা মো: আ:
গনি সরকার৷ তার উপর ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া৷ কৃতিত্বের সাথে
প্রাইমারি পাশ করে করিমগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে
ভর্তি হলেন দোলনা৷ ছোট্টমেয়ের ছোট্ট মনে প্রতিবেশীদের জন্য
অফুরন্ত মায়া৷ কারো কষ্ট দেখলে আকুল হয়ে কাঁদতেন দোলনা৷ এগিয়ে
যেতেন একটু সহযোগিতা করার আশায়৷ এভাবেই কেটে গেল দুটো বছর৷
অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত হলেন দোলনা৷ বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকলো
বাড়িতে৷ বাবা-মা দোলনার লেখাপড়া বন্ধ করে দিলেন৷ করিমগঞ্জ
থানার কাদির জংগল ইউনিয়নের জংগলবাড়ীর ইসলামপাড়া গ্রামের মো:
ফয়জুদ্দিনের বড় ছেলে মুদি দোকানদার মো: শামসুদ্দিনের সাথে তার
বিয়ে দিলেন৷ পাত্র এসএসসি পাশ, বিপত্মীক ও এক কন্যা সন্তানের
জনক৷ যৌতুক হিসাবে পাত্রকে দশ হাজার টাকা দেওয়া হয়৷ বিয়ের রাতে
ঘুম ঘুম চোখে কিশোরী দোলনা দেখলেন, তিনি শুধু আজ একজনের বৌ নন,
তিনি একটি কন্যা সন্তানের মা’ও বটে৷ ঘরের বড় বৌ হওয়ায় প্রায় সব
ধরনের দায়িত্ব দোলনার উপরে পড়লো৷ ছোটবেলা থেকেই বাবার বাড়িতে
দেখে এসেছেন অভাব আর অভাব৷ স্বামীর সংসারে এসে আরো কঠিন অভাবের
মুখে পতিত হলেন তিনি৷ নেত্রকোনা বাজারে ছোট্ট একটি মুদি দোকান
ছিল তার স্বামীর৷ দোকানের আয় দিয়ে মাসে পনের দিনও চলতো না৷
অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটতে লাগলো৷
বিয়ের এক বছরের মধ্যে দোলনা অনুভব করলেন, তিনি মা হতে চলেছেন৷
তার শরীরে অন্য এক মানুষের উপস্থিতি৷ নয় মাস পর দোলনা জন্ম
দিলেন একটি কন্যা সন্তানের৷ আদর করে মেয়ের নাম রাখলেন রানী৷
কিন্তু তার জন্য তো চাই অন্ন-বস্ত্র আর বাসস্থানের৷ বাসস্থানের
প্রয়োজন মেটাতে পারলেও অন্ন-বস্ত্রের যোগান দোলনা দেবেন কোথা
থেকে! নিজেদেরই তো পেটে খাবার জোটে না৷ লোকসান হওয়ায় দোকানটা
ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে কোনো চাকরি করার পরামর্শ দিলেন দোলনা তার
স্বামীকে৷ যেহেতু এসএসসি পাশ করেছেন দোলনার স্বামী, সেহেতু
ছোটখাট কোনো চাকরি পেতেও পারেন সেই আকাঙক্ষায় ঢাকা যেতে রাজী
হলেন দোলনার স্বামী৷ ঢাকা যাওয়ার সময় দোলনা বেগম তার স্বামীকে
বলেছিলেন যে, ‘তোমার ভাগ্যের চাকা কেউ এসে ঘুরিয়ে দেবে না৷
তোমার ভাগ্যের চাকা তোমাকেই ঘুরাতে হবে৷’ দোলনার এ কথা দোলনার
স্বামী জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মনে রেখেছিলেন৷ কিন্তু
প্রবাদ আছে, অভাগা যে দিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায়৷ দোলনার
স্বামীও ঢাকায় এসে কোনো চাকরি না পেয়ে হতাশার সাগরে যেন তলিয়ে
যাচিছলেন৷ এদিকে দোলনার কানে, গলায়, হাতে যেটুকু স্বর্ণালংকার
ছিল, তা বিক্রি করে মাত্র এক হাজার টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন
দোলনার স্বামী৷ ইতিমধ্যে প্রায় ছয়শত টাকা খরচ হয়ে গেছে
ইতোমধ্যেই৷
একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন দোলনার স্বামী কোনো একটা কাজের
আশায়৷ দেখতে পেলেন, কিছু লোক রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসে নানা
রকম জিনিসপত্র বিক্রি করছে৷ তখন দোলনার স্বামী তিনশত টাকার জুতা
কিনে বসে পড়লেন ফুটপাতে৷ এতে নাম মাত্র টাকা লাভ হলো৷ সে টাকা
দিয়ে আবার জুতা-স্যান্ডেল কিনে ফুটপাতে বসে বিক্রি করলেন৷ এভাবে
দিন যেতে লাগলো, সাথে টাকার পরিমাণও বাড়তে থাকলো৷ কিছুদিন পর
দোলনার স্বামী ফুটপাতে একটি দোকান দিলেন৷ আয় রোজগার ভালোই হতে
থাকলো৷ দু মেয়েসহ দোলনাকে তার স্বামী ঢাকায় নিয়ে এলেন৷ ওদের
তখন আর না খেয়ে থাকার মতো অবস্থা ছিল না৷ সংসারে মোটামুটিভাবে
সচছলতা ফিরে এলো৷ আর ধীরে ধীরে উন্নতি হতে লাগলো দোলনার
স্বামীর ব্যবসায়৷ একে একে পাঁচটি কন্যা সন্তানের মা হলেন দোলনা৷
ইতোমধ্যে দোলনার স্বামী ফুটপাত ছেড়ে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের
দ্বিতীয়তলায় রানী সুজ নামে একটি পাইকারি জুতার দোকান দিলেন৷
বস্তির ঘর ছেড়ে ভাড়া নিলেন একটা ফ্ল্যাট৷ সুখে দিন কাটছিল
দোলনার৷ ১৭ বছর বয়সে বড় মেয়েকে বিয়ে দিলেন৷ বড় মেয়েটি সুন্দরী
হওয়ায় বাজারের মধ্য দিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় বখাটে ছেলেরা তাকে
বিরক্ত করতো৷ তাই মান-সম্মান যাওয়ার ভয়ে অল্প বয়সেই মেয়েকে
পঁচিশ হাজার টাকা যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলেন৷ এরপর দ্বিতীয়
মেয়েটির পালা৷ তাকেও একই কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বোনের ছেলের
সাথে বিয়ে দিলেন৷ বিয়েতে রঙিন টিভিসহ ফার্ণিচার দিলেন যৌতুক
হিসাবে৷ সবার কপালে নাকি সুখ বেশিদিন সয় না৷ ৬ষ্ঠ সন্তান
জন্মদানের জন্য দোলনা ঢাকা থেকে শ্বশুরবাড়ি এলেন৷ এবার একটি
ছেলে সন্তানের জন্ম দিলেন৷
দোলনাকে নিজ পৈতৃক বাড়িতে রেখে দোলনার স্বামী চলে গেলেন ঢাকায়৷
ঢাকা যাওয়ার পথে স্বামী অজ্ঞানপাটির কবলে পরে জ্ঞান হারান৷ পরে
তার চিকিৎসা করে লাভ হয়নি৷ দোলনার স্বামী মারা যান৷ দোলনা তার
সর্বস্ব বিক্রি করেও তাকে বাঁচাতে পারলেন না৷ স্বামীর হঠাৎ
মৃত্যুতে দিশাহারা হয়ে পড়লেন তিনি৷ চার মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে কী
করে চলবেন তিনি৷ তিন রুমের একটা টিনশেড দালান ছাড়া একটা টাকাও
তার স্বামী রেখে যেতে পারেননি৷ মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় চলতে
থাকলো দোলনার সংসার৷ এতে করে একবেলা খাবার থাকে তো দুই দিন ঘরে
খাবার থাকে না৷ এভাবে চলতে ভালো লাগছিলো না৷ নিজ ভাগ্য নিজেকেই
গড়তে হবে৷ কিন্তু কী ভাবে? কোথা থেকে শুরু করবেন ঠিক বুঝতে
পারছিলেন না দোলনা৷ এ দিকে দু মেয়ে সাথী ও রনি কৃতিত্বের সাথে
অষ্টম শ্রেণিতে উঠল; কিন্তু লেখাপড়ার খরচ না দিতে পারায় স্কুলে
যাওয়া বন্ধ করে দিল৷ স্কুল থেকে শিক্ষকরা সাথী রনির লেখাপড়ার
দায়িত্ব নিলেন৷ আবার তারা স্কুলে যেতে শুরু করল৷
এসএসসি পরীক্ষায় সাথী, রনি ভালো করলো৷ একদিন সাংবাদিক সাদেক
আহম্মেদ স্বপনের কাছে দোলনা উজ্জীবক প্রশিক্ষণের কথা জানতে
পারলেন৷ এবং মেয়ে সাথীকে নিয়ে ২০০৫ সালের ১৩-১৬ আগস্ট উপজেলা
পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ৭৩৫তম ব্যাচে উজ্জীবক প্রশিক্ষণ
গ্রহণ করেন৷ উজ্জীবক প্রশিক্ষণে নারীর ক্ষমতায়ন আলোচনাটি শুনতে
শুনতে কেঁদেছেন অনেকবার৷ দোলনা দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ও উজ্জীবক
প্রশিক্ষকদের কাছে চির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন যে, আমাদের
দেশের প্রতিটি নারীর এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা প্রয়োজন৷ তা হলে আর
নারীদের কারো বোঝা হয়ে থাকতে হবে না৷ নারীরা সংসার ধর্মের
পাশাপাশি ঘরে বসেই কিছু না কিছু আয় করতে পারবেন এবং সংসারে
নিজের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি ও নিজের একটি মত প্রকাশের অধিকার
পাবেন৷
উজ্জীবক প্রশিক্ষণ নেয়ার পর দোলনা করিমগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ের
শিক্ষিকা চন্দ্রা সরকারের নেতৃত্বে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন,
যার নাম ‘অগ্রদূত মহিলা সমবায় সমিতি’৷ এ সমিতিতে ৩০ জন মহিলা
সদস্য আছে৷ এরা সবাই মাসে ৫০ টাকা করে সঞ্চয় করে৷ এ সমিতির
মাধ্যমে দুস্থ মহিলাদের টেইলারিং ও হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ দিয়ে
সমিতিতেই অর্ডারি কাজ করানো হতো৷ দোলনা অগ্রদূত মহিলা সমবায়
সমিতি থেকে দু হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সাথী ও রনিকে কলেজে ভর্তি
করালেন৷ কলেজেও সাথী, রনি শিক্ষকদের সহযোগিতায় লেখা-পড়া করতে
লাগলো৷ দোলনা যখন রান্না করতে যেতেন তখন প্রতিবার রান্নার চাউল
থেকে এক মুষ্ঠি চাউল উঠিয়ে রাখতেন৷ এভাবে মাসে তার প্রায় তিন/চার
কেজি চাউল জমা হতো৷ সেই চাউল বিক্রি করে প্রতিমাসে একটি করে
মুরগি কিনতেন৷ এভাবে ৫/৬টি মুরগি হলো দোলনার৷ মুরগিগুলোকে
নিজের সন্তানদের মতো করেই যত্ন করতেন৷ বাড়ির আশেপাশে খালি জায়গা
ছিল না৷ যতোটুকু ছিল, সেখানে লাউ, সিম, বরবটি, পুঁইশাকের গাছ
লাগিয়ে লতাগুলো উঠিয়ে দিতেন টিনের চালের উপর৷ ভালোই ফলন হতো৷
আর যা ফলতো তা থেকে নিজের চাহিদা মিটিয়েও বাড়ির আশে-পাশের
মহিলাদের কাছে বিক্রি করতেন দোলনা৷ ফলে সংসারে কিছুটা সচছলতা
ফিরে এসেছিল৷
সাথী ও রনি কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করে৷ পাশ করার পর
ইউনিলিভার- এ চাকরি হলো৷ দু’ বোনের মোট মাসিক বেতন হলো পনেরো
হাজার টাকা৷ আর মুরগির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২৫টি হলো৷ প্রতিদিন
মুরগির ডিম দিয়ে নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও ২/৩ হালি ডিম বিক্রি
করেন দোলনা৷ ছোট দুমেয়ে ও এক ছেলে স্কুলে পড়ে৷ তার সংসারে অভাব
নেই বললেই চলে৷ দোলনা ঘৃণা করেন যৌতুক প্রথাকে৷ সাথী ও রনীকে
বিয়ে দিয়েছেন যৌতুক ছাড়াই৷
দোলনা সেবিকার সনদপত্র না পেলেও আজ একজন অভিজ্ঞ ধাত্রী৷ শুধু
ধাত্রী হিসেবে নয়, একজন মমতাময়ী নারী হিসেবেও তিনি সকলের কাছে
পরিচিত৷ তিনি নিজের খাবার তুলে দেন অনাহারীর মুখে৷ কারো উপকার
করতে পারলেই যেন দোলনা মনে শান্তি পান৷ নারীদিবস ও কন্যাশিশু
দিবসে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন৷ আর প্রায়ই মনে মনে উচচারণ করেন,
আত্মশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তি কখনোই দরিদ্র থাকতে পারে না৷ |
|
|
|
|
|
National
Girl Child Advocacy Forum |
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |
|