| Main Links |
| |
|
standing Committee of Forum |
| |
|
Recent |
|
|
|
|
বাংলাদেশের সাঁওতাল কন্যাশিশু
ড. মোস্তাফিজুর রহমান শাহীন* |
|
|
মূল ধারার কন্যাশিশুদের তুলনায় সাঁওতাল কন্যাশিশুরা অনেক বেশি
বঞ্চিত এবং নির্যাতিত। এক কথায়, তারা নাগরিক অধিকার থেকে প্রায়
পুরোপুরি বঞ্চিত। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের
আওতায় যেখানে দেশের মূলধারার প্রায় ৯৩ ভাগ কন্যাশিশু বিদ্যালয়ে
যাওয়ার সুযোগ পায় সেখানে সাঁওতাল কন্যাশিশুর সংখ্যা মাত্র ২৩
শতাংশ। তাদের পশ্চাৎপদতা কেবলমাত্র শিক্ষা ক্ষেত্রের মধ্যেই
সীমাবদ্ধ নয়, তারা শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, চিকিৎসা,
নিরাপদ আবাসস্থল, পুষ্টিসহ সকল ক্ষেত্রেই আজ বঞ্চিত। এছাড়া
বাল্যবিবাহ, স্বল্প বয়সে মাতৃত্ব, মানসিক ও যৌন হয়রানি,
অশ্লিলভাবে ঈভটিজিং, জমিতে কৃষাণী হিসেবে কাজ করানোর পর
পারিশ্রমিক না দেওয়া কিংবা অল্প পারিশ্রমিক দেওয়া- প্রভৃতি
বিষয়গুলো আজ তাদেরকে আষ্টে-পৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। প্রতি বছর ৩০
সেপ্টেম্বর এলে আমরা কন্যাশিশুদের অধিকার নিয়ে কথা বলি,র্ যালী
করি। আলোচনা সভা, সেমিনার প্রভৃতির মাধ্যমে তাদের পিছিয়ে পড়ার
কারণ ব্যাখ্যা করি। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবেছি, মূল ধারার
কন্যাশিশুদের তুলনায় সাঁওতাল কন্যাশিশুরা অ-নে-ক অ-নে-ক পিছিয়ে
আছে? তাদের জন্য কিছু করতে হবে...?
আমার গ্রামের বাড়ির পাশে একটি সাঁওতাল গ্রাম অবস্থিত। এছাড়া
কিছুদিন পূর্বে পেশাগত দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত কৌতুহল থেকে
দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি ও নবাবগঞ্জ থানার সাঁওতাল অধ্যুষিত
কয়েকটি গ্রামে গিয়েছিলাম। সরজমিনে ঘুরে যে বিষয়টি প্রথমেই আমার
দৃষ্টি কেড়েছিল তা হচ্ছে অধিকার বঞ্চিত, শোষিত সাঁওতাল
কন্যাশিশুরা এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে। দেশের নারী সমাজ যখন
শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে
অধিষ্ঠিত হচ্ছে, কন্যাশিশুরা যখন লেখা-পড়ায় এগিয়ে চলেছে এবং
ছেলেদের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল করছে তখন সাঁওতাল
পল্লীর নারী সমাজ ও কন্যাশিশুরা দু’মঠো ভাতের জন্য নিরন্-র
সংগ্রাম করে চলেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি- আজ তাদের কাছে
অপরিচিত ও অধরা এক শব্দ।
সাঁওতাল কন্যাশিশুর পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ নিরক্ষরতা। দেশে
যখন সাধারণ শিক্ষার হার প্রায় ৬৬% তখন সাঁওতাল সম্প্রদায়ে
মাত্র ১৭% সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। কন্যাশিশু ও নারীর ক্ষেত্রে এই
হার ৭ শতাংশের সামান্য উপরে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যিমিক ও
স্নাতক পর্যায়ে নারী শিক্ষার হার একেবারেই নগণ্য। আর
স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কোন সাঁওতাল নারী লেখাপড়া করেছে কিনা- তা
আমার জানা নেই। পরিবেশগত নিরাপত্তা, সামাজিক ও আর্থিক সমস্যা
এবং ভাষাগত কারণে সাঁওতাল কন্যাশিশুরা লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত
হচ্ছে। দেশে প্রচলিত সাধারণ বিদ্যালয়ে বাঙালি শিক্ষার্থীরা
সাঁওতাল শিশুদের ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে। তাদের সাথে কথা বলে না
এমনকি তুচ্ছ কারণেও জাত তুলে গালি দেয় এবং মারধর করে।
কন্যাশিশুরা যদি প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক
পর্যায়ে ভর্তি হয় তখন বাঙালি ছাত্রদের দ্বারা নানারকম মানসিক ও
যৌন হয়রানির শিকার হয়। বাঙালি ছাত্ররা তাদের কোনোভাবেই সহপাঠী
হিসেবে মেনে নিতে চায় না। বন্ধুত্বের সুসস্পর্ক অথবা ভালোলাগার
কথা ব্যক্ত করার পরিবর্তে তাদেরকে সরাসরি আপত্তিকর প্রস্-াব
দেয়। যা কখনোই মেনে নেওয়ার নয়। এমনকি কখনো কখনো অর্থের বিনিময়ে
আপত্তিকর প্রস্-াবে রাজি করানোর জন্য চলে ব্যর্থ প্রচেষ্টা। ফলে
বাঙালি ছাত্র এবং সাঁওতাল কন্যাশিশুর মধ্যে সহপাঠীর সহযোগী
মনোভাবের পরিবর্তে বিষয়টি ভিন্নরূপ পায়। এ পর্যায়ে মেয়েটি
স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। ক্ষেত্রবিশেষে স্কুল ছেড়েও তারা নিস্-ার
পায় না। বসতবাড়িতে গিয়ে হানা দেওয়া, পথরোধ এমনকি কোন কোন
ক্ষেত্রে মেয়েটি ধর্ষিত পর্যন্- হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য,
দেশের গণমাধ্যমগুলো সাঁওতালদের এসকল ঘটনাকে খুব একটি গুরুত্ব
দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। কেবলমাত্র তাদের মধ্যে কেউ নিহত হলে
সেটিকে পত্রিকার পাতার কোনো একটি অংশে যেনতেনোভাবে প্রকাশ করে
থাকে। ফলে ঘটনাটি গুরুত্বহীন ভাবেই রয়ে যায়।
সাঁওতাল সমাজের একটি সনাতন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ছেলে-মেয়ে একত্রে
দলবেঁধে মাঠে কাজ করা। সমাজ এগিয়ে চলেছে। সবকিছুর ইতিবাচক
পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু সাঁওতাল নারী ও কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে
পরিবর্তন হয়েছে নেতিবাচক। সাঁওতাল ছেলেরা এখন আর পূর্বের মত
মাঠে কাজ করে না। তারা সপ্তাহে দু-একদিন রিক্সা-ভ্যান চালায়,
আর বাকী সময় ঘরে শুয়ে-বসে কাটায়। কিন্তু সাঁওতাল নারী ও
কন্যাশিশুরা রোদে পুড়ে এবং বৃষ্টিতে ভিজে পূর্বের মতই নিরন্-র
কৃষাণীর কাজ করে চলেছে। কাজের ক্ষেত্রে নারী ও কন্যাশিশুর কদর
বেশি হলেও তাদের বাজার মূল্য কম। ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সী একটি
কন্যাশিশু যে পরিশ্রম করে তা একজন পূর্ণাঙ্গ নারী কিংবা
পুরুষের তুলনায় কোন অংশে কম নয়। কিন্তু শ্রমের মূল্য অর্ধেক,
এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে তা পুরুষের তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ।
কন্যাশিশুর পারিশ্রমিক প্রদানের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ জটিলতা।
কোন কারণ ছাড়াই তাদের প্রাপ্য মজুরি দিতে গড়িমসি করা হয় এবং
কোন কোন সময় এভাবে আর টাকা দেওয়া হয় না। অনেক সময় এসকল
কন্যাশিশুকে পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা বলে বাড়িতে ডেকে নিয়ে কৌশলে
শ্লীলতাহানী এমনকি ধর্ষণ পর্যন্- করা হয়। কিন্তু সাঁওতাল
কন্যাশিশু বিষয়টি চেপে যায়। যার অন্যতম উদাহরণ নিম্নরূপ:
দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি থানার আমড়াকাঠাল গ্রামের এক সাঁওতাল
কন্যাশিশু (বয়স : ১৪)। ২০০৬ সালের জুন মাসে ইরি-বরো মৌসুমে
কাজ শেষে পার্শ্ববর্তী গ্রামের ইসমাইল মোড়লের কাছে টাকা চাইলে
ভূমি মালিক তাকে টাকা নিতে পরের দিন শেষ বিকেলে বাসায় যেতে বলে।
ভূমি মালিকের কথায় সরল বিশ্বাসে কন্যাশিশুটি টাকা নিতে যায়।
ইসমাইল মোড়ল তাকে অহেতুক বসিয়ে রাখে এবং সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার
দিকে টাকা প্রদান করে। টাকা নিয়ে কন্যাশিশুটি বাড়ি ফেরার পথে
ইসমাইল মোড়ল মাঠের মাঝে তার পথরোধ করে এবং জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।
অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে বিষয়টি জানানোর পর ইসমাইল
মোড়ল সাঁওতাল পল্লীর মাতববরের মাধ্যমে চিকিৎসা বাবদ নগদ দুইশত
এবং বাকী আটশত টাকার বিনিময়ে বিষয়টির রফা করে। যদিও পরবর্তীতে
বাকী টাকা আর পরিশোধ করে নি। নির্যাতিত কন্যাশিশুটির বাবা
জানান, তাকে এবং সাঁওতাল মাতববরকে ইসমাইল মোড়ল হুমকির মাধ্যমে
মীমাংসা করতে বাধ্য করেছিল।
মূল শ্রোতধারার জনগোষ্ঠীদের দ্বারা নির্যাতিত এসকল কন্যাশিশু
কখনোই সুবিচার পায় না। বিচারের নামে তাদের অহেতুক হয়রানি করা
হয় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে উল্টো তাদেরই দোষী সাব্যস্- করে
বিচারের নামে আরেকবার নির্যাতন করা হয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা
যায়, ২০০৪ সালের জুলাই মাসে দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি থানার বুসকি
পাড়া সাঁওতাল পল্লীর এক তরুণী সকালে ঘুম থেকে জেগে প্রকৃতির
ডাকে সাড়া দিতে পাটক্ষেতে যায় এবং একজন স্থানীয় বাঙালি দ্বারা
ধর্ষিত হন। বিষয়টি নিয়ে গ্রাম্য সালিশ বসে। সালিশে তরুণীটিকে
চরিত্রহীন এমনকি গ্রাম্য পতিতা হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করা
হয়। সাঁওতাল সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে এর প্রতিবাদ করলে বিষয়টি
অন্যদিকে মোড় নেয়। শেষ পর্যন্- সালিশের রায়ে ‘মেয়েকে কখন,
কোথায় এবং কিভাবে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেতে হয়- এরূপ
সাধারণ শিক্ষা’ দিতে না পারার অজুহাতে তার বাবাকে শাস্-ি
স্বরূপ ‘জুতা পেটা’ করা হয় এবং ছেলেকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা
করা হয়। কিন্তু আজ অবধি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারটি জরিমানার টাকা
পায় নি।
শুধু বাঙালি পুরুষ নয় সাঁওতাল পুরুষ এমনকি জন্মদাতা পিতা ও
স্বামীর দ্বারা সাঁওতাল নারী ও কন্যাশিশুরা নিয়মিত নির্যাতিত
হয়। প্রতিবেশীদের দ্বারা যৌন হয়রানি সাঁওতাল পল্লীর একটি অতি
সাধারণ ঘটনা। সবচেয়ে আশ্চার্যের বিষয়, এর কোন বিচারও হয় না।
সাঁওতাল মহিলাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পূর্বে সমবয়সী কিংবা
দু-চার বছরের বড়দের দ্বারা সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত এসব কন্যাশিশু
নির্যাতিত হত। কিন্তু বর্তমানে বাবা, কাকা এমনকি দাদুর বয়সী
পুরুষদের দ্বারাও কন্যাশিশুরা নির্যাতিত হচ্ছে, যা কন্যাশিশুর
মানসিক সুস্থতাকে করছে বিঘ্নিত। মহিলারা আরো জানান, বিষয়টি নিয়ে
পল্লীর কন্যাশিশুরাও সর্বদা আতঙ্কগ্রস্থ থাকে। পাশাপাশি তারা
নিজেরাও ভীত থাকেন এবং নিরাপত্তার কথা ভেবে মাঠে কাজে যাওয়ার
সময় তাদেরকে সাথে নিয়ে যান।
হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের উপর সাঁওতাল
কন্যাশিশু ও নারীর বিন্দুমাত্র অধিকার থাকে না। পারিশ্রমিক
হিসেবে পাওয়া টাকার পুরো অংশ তুলে দিতে হয় বাবা কিংবা স্বামীর
হাতে। সংসারের কর্তা পুরুষটি সেই টাকা দিয়ে প্রথমে নেশা করে এবং
অবশিষ্ট টাকা দিয়ে চাল-ডালসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করে।
নেশাগ্রস্থ অবস্থায় সাঁওতাল পুরুষরা স্ত্রী-কন্যাদের নিয়মিত
শারীরিক নির্যাতন করে। সাঁওতাল নারীরাও এর কোন প্রতিবাদ করে
না। তাদের মতে, এটি তাদের পারিবারিক সংস্কৃতিরই অংশ। কয়েকজন
নারী জানান, স্বামী তাদের স্ত্রী’র উপার্জিত টাকা দিয়ে নেশা করে।
ফলে বাজার করে দিতে পারে না। কিন্তু খাবার সময় হলে বাড়ি এসে
খেতে চায়। খাবার দিতে না পারলেই স্বামীর হাতে নির্যাতিত হতে হয়।
মাঠে কৃষাণীর কাজ শেষে বাড়ি ফিরে রান্না করতে দেরি হলে স্বামী
তাদের শারীরিক নির্যাতন করে এবং কাজ থেকে ফিরতে বিলম্ব ঘটলে
তাদেরকে অহেতুক সন্দেহ করে।
বাল্যবিবাহ সাঁওতাল সামাজে একটি অতি সাধারণ ঘটনা। শতকরা ৯৫ ভাগ
কন্যাশিশুর বিয়ে হয় ১৪ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে। ১৫ বছর বয়সের
মধ্যে যাদের বিয়ে হয় না তারা হয় দেখতে অসুন্দর, নতুবা
প্রতিবন্ধী। সাধারণ অবস্থায় ১৫ বছরের পর কোন মেয়ে অবিবাহিত থাকে
না। আরও ভয়ঙ্কর তথ্য হচ্ছে, এই বিয়ে শুরু হয় দশ বছর বয়স থেকে।
এমনকি নারীত্ব প্রাপ্তির পূর্বেও বিয়ের ঘটনা বিরল নয়। অপ্রাপ্ত
বয়স্ক এসকল কন্যাশিশু বিয়ের পরবর্তী একবছরের মধ্যে মা হয়।
তাদের জন্ম নেওয়া শিশুদের অধিকাংশই স্বল্প ওজনের এবং অপুষ্ট।
সাঁওতাল সম্প্রদায় জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সাথে খুব একটি পরিচিত
নয়। তাই তারা ১৪/১৫ মাস পর পর সন্-ানের জন্ম দেয়। দু-একটি
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় পাওয়া শিক্ষা থেকে তারা পদ্ধতি
বলতে কেবলমাত্র ‘খাবার পিলকে’ বোঝে। ফলে অপ্রাপ্ত বয়স্ক এই
কন্যাশিশুরা একের পর এক সন্-ান জন্মদান কিংবা ‘পিল’ খেয়ে
শারীরিকভাবে মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হন। পাশাপাশি এই অপুষ্ট
শরীর নিয়ে তাদের প্রতিদিন মাঠে কিষাণীর কাজ করতে হয়। সাঁওতাল
নারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঋতু চলাকালে এবং গর্ভাবস্থায়ও
তাদেরকে মাঠে কাজ করতে হয়। নয় মাসের গর্ভাবস্থায়ও মাঠে কাজ
করার নজির সাঁওতাল পল্লীতে একেবারে বিরল ঘটনা নয়। শারীরিক
সমস্যার কারণে কাজ করতে না গেলে তারা স্বামী এবং অনেক সময়
বাবার দ্বারা নির্যাতিত হন। অধিকাংশ বাবা চান তার মেয়ে
লেখাপড়ার পরিবর্তে মাঠে কাজ করে অর্থ উপার্জন করবে। এমনভাবে
স্বামীও চায় তার স্ত্রী মাঠে কাজ করবে। বিয়ের ক্ষেত্রে যৌতুক
প্রথার প্রচলন থাকলেও মাঠের কাজে কন্যার পারদর্শিতা বিশেষভাবে
বিবেচনা করা হয়।
শিক্ষা-দিক্ষায় পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের এসকল প্রান্-িক
কন্যাশিশু নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। একবিংশ শতাব্দিতে এসেও দেখা
যায়, সভ্যতার আলো এখনো তাদের কাছে পৌঁছায় নি। আব্রাহাম
লিঙ্কনের প্রচেষ্টায় বিশ্ব থেকে দাস প্রথার অবসান হলেও এসকল
কন্যাশিশু তাদের বাবা এবং স্বামীর দ্বারা নব্য দাসত্বের
জিঞ্জিরে আবদ্ধ। নির্যাতিত এই কন্যাশিশুরা অবলা পশুর মত সকল
নির্যাতন সহ্য করে চলেছেন।
দেশের সরকারি নীতি নির্ধারক, সুশীল সমাজ এবং নারী নেত্রীসহ
আমাদের সকলের উচিৎ, প্রান্-িক এই কন্যাশিশুদের প্রতি সজাগ
দৃষ্টি দেয়া। তাদের বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত ও কার্যকরী
পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। উল্লেখ্য, সার্বিকভাবে শিশুদের
কল্যাণের লক্ষ্যে গৃহীত একক নীতির মাধ্যমে দেশের সকল
সম্প্রদায়ের শিশুর উন্নয়ন সম্ভব নয়। যেমনটি ঘটেছে সাঁওতালসহ
অন্যান্য আদিবাসী কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে। এই কন্যাশিশুর মুক্তির
জন্য সরজমিনে গিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নীতি
প্রণয়ন করতে হবে। মুক্তি দিতে হবে তাদের নবসৃষ্ট দাসত্বের
আধুনিক জিঞ্জির থেকে। আর এভাবেই সম্ভব, বাংলাদেশের সাঁওতাল
কন্যাশিশুসহ অন্যান্য সকল কন্যাশিশুর অধিকার সুনিশ্চিত করা।
তথ্যসূত্র
১. ২০০১ সালের আদমশুমারির রিপোর্ট
২. গবংনধয কধসধষ, উৎ. গঁযধসসধফ ঝধসধফ ধহফ ঘরষঁভধৎ ইধহঁ, ঝধহঃধষ
ঈড়সসঁহরুঃ রহ ইধহমষধফবংয : চৎড়নষবসং ধহফ চৎড়ংঢ়বপঃং, ঢ়ঁনষরংযবফ
নু জবংবধৎপয ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঈড়ষষবপঃরাব, উযধশধ, অঁমঁংঃ-২০০৩
৩. দৈনিক আনন্দ বাজার, মার্চ ০৩, ২০০৭, কলকাতা, ভারত
৪. ২০০১ সালের বিভিন্ন তারিখের দৈনিক জনকন্ঠ, ঢাকা, বাংলাদেশ
৫. রিসার্স এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কালেকটিভ-এর ‘বাংলাদেশের
সাঁওতালদের সমস্যা এবং উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণার রিপোর্ট
৬. জয়ন্- আচার্য, আদিবাসী জনপদের পথে প্রান্-রে, শ্রাবণ
প্রকাশনী, ঢাকা, জুন-১৯৯৮
৭. মেসবাহ কামাল ও আরিফাতুল কিবরিয়া, বিপন্ন ভূমিজ, গবেষণা ও
উন্নয়ন কালেকটিভ, ঢাকা, এপ্রিল-২০০৩
৮. সঞ্জিব দ্রং, বাংলাদেশের বিপন্ন আদিবাসী, নওরোজ কিতাবিস্-ান,
ঢাকা, ফেব্রুয়ারি-২০০১
৯. তারপদ রায়, সাঁওতাল বিদ্রোহের রোজনামচা, দেজ পাবলিশিং,
কলকাতা-৭০০০৭৩, জানুয়ারি-১৯৯৫
১০. সঞ্জিব দ্রং, গণতন্ত্র, সুশাসন ও বাংলাদেশের আদিবাসী,
সূচীপত্র, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি-২০০৪
১১. গবংনধয কধসধষ, টহনৎড়শবহ ঝরষবহপব, জবংবধৎপয ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ
ঈড়ষষবপঃরাব, উযধশধ, গধৎপয-২০০৬
১২. দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থানার আমড়াকাঠাল, তাঁতীপাড়া,
জয়পুর ও বুড়িকাঠাল গ্রামের ৪৭ জন সাঁওতালের সাক্ষাৎকার
১৩. আলতাফ পারভেজ, প্রতিরোধ ও উন্নয়ন, নাগরিক উদ্যোগ, ঢাকা,
এপ্রিল-২০০৭
১৪. সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৫২ তম বাষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ
জার্নাল ‘হুল’, প্রকাশক, বাংলাদেশ আধিবাসী অধিকার আন্দোলন, ঢাকা,
জুন-২০০৭
|
|
|
|
|
|
National
Girl Child Advocacy Forum |
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |
|