General Publications

 
Search  ...a  page
Main Links
 
standing Committee of Forum
 
 

 

কন্যাশিশুর অধিকার: প্রসঙ্গ বাংলাদেশ

ইভটিজিং : চাই সামাজিক প্রতিরোধ

একটি মুখের হাসির জন্য

আদিবাসী সমাজে নারী ও উন্নয়ন পরিকল্পনা

 


কন্যাশিশু- ৪

আদিবাসী সমাজে নারী ও উন্নয়ন পরিকল্পনা
তপতী সাহা*

 


এবার ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘নারী ও কন্যাশিশুর উন্নয়নে বিনিয়োগ’৷ নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার এ যাবৎ বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন৷ ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্যটি নারীর প্রতি ন্যায়সম্মত (
equitable) দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন৷

নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সাম্য (
equity) দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে৷ বিশেষ পদক্ষেপ (special measure) মানে বাড়তি সুবিধা নয়৷ সুবিধাবঞ্চিত, অনগ্রসর গোষ্ঠীকে এগিয়ে নেয়ার জন্য রাষ্ট্র যখন বিশেষ মনোযোগ দিয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে সেটাই সাম্য দৃষ্টিভঙ্গি (equity approach)৷ এই এ্যাপ্রোচ যখন নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় তাকে বলা হয় জেন্ডার সাম্য (gender equity)৷ জেন্ডার সাম্য ও সমতা নিয়ে আলোচনা করা আমার আজকের লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়৷ ”নারী ও কন্যাশিশুর উন্নয়নে বিনিয়োগ” এই স্লোগানের মাধ্যমে যে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচেছ, সেটি হচেছ নারী ও কন্যাশিশুর উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া, বিশেষ বরাদ্দ দেয়া৷ তবে এই বিশেষ পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা হতে হবে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা ও গোষ্ঠীর প্রয়োজন অনুসারে৷ কারণ শ্রেণী, অঞ্চল ও গোষ্ঠীভেদে নারী ও শিশুর প্রয়োজন এক রকম নয়৷

বাংলাদেশের আদিবাসী গোষ্ঠীর নারী ও কন্যাশিশু আমার আজকের লেখার মূল প্রতিপাদ্য৷ আদিবাসী গোষ্ঠীর নারীদের বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান, তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন পদ্ধতি ও সংস্কৃতি এসব কিছুই বিবেচনা করতে হবে আদিবাসী গোষ্ঠীর উন্নয়ন পরিকল্পনার সময়৷ তার আগে আমরা দেখি আদিবাসী সমাজে নারীদের অবস্থা ও অবস্থান কেমন?
আদিবাসী সমাজে নারী
বাংলাদেশে মোট প্রায় ৪৫টি আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস৷ যাদের বেশির ভাগই বাস করে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, রাজশাহী, সিলেট, পটুয়াখালী ও বরগুনার বিভিন্ন অঞ্চলে৷ চাকমা, গারো, মনিপুরি, মারমা, সাঁওতাল, ওরাও, খাসিয়া, ত্রিপুরা, মুরং, হাজং এবং রাখাইন সম্প্রদায়ই প্রধানত বাংলাদেশের পরিচিত আদিবাসী জনগোষ্ঠী৷ বাংলাদেশে বর্তমানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১২,০৫,৯৭৮৷ এর মধ্যে নারী ৫,৮৯,১০০ ও পুরুষ ৬,১৬,৮৭৮ (
Population Census 2001, BBS 2006)৷

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচেছ৷ এর অন্যতম কারণ হচেছ দারিদ্র্য ও কিছু প্রভাবশালী বাঙালি জনগোষ্ঠীর শোষণ-লুন্ঠন৷ আদিবাসী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বিভিন্ন রকম বদ্ধমূল ধারণা প্রচলিত রয়েছে৷ বিশেষত আদিবাসী নারীদের সম্পর্কে মনে করা হয় যে তারা তাদের সমাজে পুরুষের চাইতে অনেক বেশি ক্ষমতায়িত৷ কেননা আদিবাসী নারী সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করেন এবং কোনো কোনো আদিবাসী সমাজে মাতৃসূত্রীয় পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে৷ যদিও সকল আদিবাসী সমাজে মাতৃসূত্রীয় পদ্ধতি প্রচলিত নেই৷ তাছাড়া সম্পত্তির অধিকার থাকলেই যে নারী সকল ক্ষেত্রে অধিকার লাভ করে এটাও ঠিক নয়৷ তবে সাধারণভাবে বলা যায়, আদিবাসী নারী বাঙালি নারীদের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনতা ও সম্মান পেয়ে থাকে৷ আদিবাসী সমাজে নারী একজন মানুষ, সমাজে আছে তার স্বাধীনতা ও অধিকার৷ এ সমাজে নারী কাজ করে ঘরে-বাইরে, ক্ষেতে-খামারে৷ এভাবে চলে আসছে আদিকাল থেকে বংশ পরম্পরায়৷ সত্যিকার অর্থে আদিবাসী সমাজে নারীদের এই সম্মানজনক অবস্থানের কথা শুনলে অবাক হওয়ার কথা৷ এখন আমরা কয়েকটি আদিবাসী গোষ্ঠীর সমাজের দিকে দৃষ্টিপাত করবো

সাঁওতাল
পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, পিতা সম্পত্তির মালিক ও পরিবার প্রধান৷ পিতার পরিচয়ে সন্তানেরা পরিচিত৷ পিতার মৃত্যুর পূর্বে সম্পত্তি ছেলের নামে লিখে দেন৷ ইচছা করলে কিছু অংশ স্ত্রীর নামে দিতে পারেন৷ বিয়ে করলে ছেলেরা পৃথক পরিবার গড়ে তোলে৷ বৃদ্ধ পিতা মাতার ভরণ পোষণের দায়িত্ব কেউই নিতে চায় না৷ এদের মধ্যে বহু বিবাহ প্রথার প্রচলন আছে৷ একজন ব্যক্তি একাধিক বিবাহ করতে পারে৷ আবার ইচছা মতো ত্যাগও করতে পারে৷ বিবাহ সংক্রান্ত্র তেমন কোনো বাধা ধরা নিয়ম নাই৷ স্ত্রীকে পরিত্যাগ করার সময় সামান্য কিছু টাকা পয়সা দিতে হয়৷

ম্রো
ম্রো সমাজে অনেকগুলো গোত্র আছে৷ একই গোত্রের ছেলে মেয়েদের মধ্যে বিবাহ হয় না৷ পিতৃতান্ত্রিক পরিবার৷ সন্তানেরা পিতার বংশ পরিচয়ে পরিচিত৷ ম্রো সমাজে সম্পূর্ণ নারী স্বাধীনতা রয়েছে৷ নারীর আলাদা পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্য নেই৷ কাজের কিছু ভাগ আছে, তা উভয়ের জন্য প্রযোজ্য৷ এই সমাজে নারী পুরুষের মতোই স্বাধীনভাবে পাহাড়ে-অরণ্যে জুমের কাজ করতে যায় ও বাজার করে, ঘর গৃহস্থালী দেখে ও সন্তান লালন পালন করে৷ একজন পুরুষও এ কাজগুলিই করে থাকে৷ এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যা থেকে সহজেই নারী পুরুষের সমান অধিকারের প্রমাণ মেলে৷ বিয়ে অনুষ্ঠান যেভাবেই হোক না কেন, কনেকে পণের টাকা দিতেই হবে এবং অস্ত্রশস্ত্রও দিতে হবে৷ বরপক্ষ ধনী অথবা দরিদ্র যাই হোক না কেন৷

রাখাইন
পিতা মূলত পরিবার প্রধান৷ সেই হিসেবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ বলা যেতে পারে৷ পিতার অবর্তমানে মাতা প্রধান৷ উল্লেখ্য যে পুত্র ও কন্যা সমানভাবে সম্পত্তির অধিকারী হয়৷ যদি স্ত্রী মারা যায় তাহলে স্ত্রীর সমস্ত সম্পত্তির মালিক হবে স্বামী৷ অনুরূপ স্বামী মারা গেলে স্ত্রী সমস্ত সম্পত্তির মালিক হবে৷ সম্পত্তির ভাগাভাগির ক্ষেত্রে ছেলে মেয়ে সবাই সমান৷ এই অর্থে মাতৃ বা পিতৃতান্ত্রিক কোনোটাই বলা যায় না৷ নারী পুরুষ উভয়ই কাজ করে৷ কৃষিকাজই রাখাইনদের মূল পেশা৷ তাঁতের কাজ আদি ও বংশগত পেশা হিসাবে বিবেচিত৷ অতীতে অবশ্য মহিলারা তুলা থেকে সুতা তৈরির কাজও করতেন৷ রাখাইনদের আরেকটি অন্যতম পেশা হলো শুঁটকি মাছের ব্যবসা এবং বাঁশ খেকে তলই তৈরি করে৷ বাঁশ থেকে বেত বানিয়ে মহিলাদের নিকট দেয়, মহিলারা তা বুননের কাজ করে৷

চাকমা
চাকমারা পিতৃতান্ত্রিক বা পিতৃপ্রধান পরিবারের আদিবাসী৷ পিতাই হলো পরিবারের প্রধান ব্যক্তি৷ তারপরের স্থান হলো মায়ের৷ পরিবারের বড় ছেলে পিতার সূত্র ধরে বংশ গণনা করে৷ বংশকে গুথি বলে৷ গুথি অর্থাৎ গোষ্ঠী বা গোত্র শব্দের সমার্থক৷ এই সমাজে জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যুতে গুথিগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম৷

মায়ের দিকের নিকট আত্মীয়কে বিবাহ করতে পারবে না৷ কনে বিয়ের পর শ্বশুরের গ্রামে চলে যায় ও স্বামীর সাথে ঘর বাঁধে৷ কনের যদি কোনো ভাই না থাকে বা ভাই অপ্রাপ্ত বয়স্ক হয় জামাইকে তার পরিবারের সঙ্গে বাস করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়৷ বিয়েতে পণ প্রথা প্রচলন আছে৷ তবে পণটি দেন বরপক্ষ৷ কোনো জামাতা যদি এককালীন পণ দিতে না পারে তবে যতদিন তা শোধ না করা হয় ততদিন কনে তার বাবার পরিবারে বাস করবে৷ কী পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে কনেকে ক্রয় করে তা এখানে উল্লেখ নাই৷ চাকমা যুবক অর্থ দিয়ে স্ত্রীকে ক্রয় করে থাকে৷ অন্য উপজাতির মধ্যে এই প্রথার প্রচলন নাই বললেই চলে৷ কনে পণ শোধ হলে বর ও কনে বরের বাবার বাড়িতে চলে যায়৷ এমন ক্ষেত্রে বাসভ‚মিকে বলা হয় মাতৃ পিতৃঅঞ্চল বা ভিটা৷

গারো, হাজং ও মান্দাই
ময়মনসিংহ জেলায় মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর উপজাতি আছে, তারা হলো- গারো, হাজং ও মান্দাই৷ গারোদের সমাজ মাতৃপ্রধান বা মাতৃতান্ত্রিক (মাতৃতান্ত্রিক মানে মাহারিবাদ)৷ সন্তানেরা মায়ের উপাধি গ্রহণ করে৷ বিয়ের পরও কোনো স্ত্রীলোক কিংবা পুরুষের কৌলিক উপাধি বদলায় না৷ গারো সমাজে বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর বাড়িতে চলে যায় এবং স্ত্রীর পরিবারভুক্ত লোক বলে গণ্য হয়৷ স্বামীর ভরণপোষণের দায়িত্ব স্ত্রীর৷ পরিবারে মায়ের কর্তৃত্ব প্রধান৷ কন্যারা মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়, সম্পত্তির উপর পুত্র বা পুরুষের কোনো প্রকার উত্তরাধিকার নাই৷ অর্থাৎ মাহারিবাদ বা মাতৃতান্ত্রিকতা সমাজে চার প্রকারে ক্রিয়াশীল যথা-১) মেয়েরা পরিবারের কর্ত্রী তথা পরিবার প্রধান, ২) মেয়েরা সম্পত্তির মালিক এবং উত্তরাধিকারী, ৩) মেয়েরা বিয়ের পরে স্বামীর বাড়িতে না গিয়ে স্বামীকে নিজের বাড়িতে আনে, ৪) পুত্র কন্যারা মায়ের গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং মাতৃকুল পদবী গ্রহণ করে৷

সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত রীতি নীতি মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরাই সকল সম্পত্তির মালিক৷ মায়ের সম্পত্তি কন্যারা সকলে সমান অংশ পাবে না৷ একমাত্র কন্যা হলে সেই সকল সম্পত্তির মালিক হবে৷ একাধিক কন্যা থাকলে পিতামাতা পরামর্শ করে যে কোন কন্যা সম্পত্তির প্রধান উত্তরাধিকারী হবে৷ তবে অধিকাংশ স্থলে কনিষ্ঠ কন্যাই উত্তরাধিকারী হয়৷ পিতামাতার মধ্যে মতানৈক্য হলে মা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়৷ উত্তরাধিকারী বা নকমা/নাকমাকে অবশ্যই পিতৃবংশী থেকে মনোনীত একজন পিসতুতো ভাই/ফুফাত ভাইকে বিয়ে করতে হবে৷ নকমার স্বামীকে নক্রম বলা হয়৷ নক্রম স্ত্রীর পরিবারের অন্য পুরুষদের চেয়ে অধিক গুরুত্ব পায়৷ উল্লেখ্য, নকমা যদি পিতৃগোষ্ঠী থেকে বিবাহ করতে আপত্তি জানায় তবে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে না৷ অন্য মেয়েরা যদি পিতার গোত্র বহিভর্‚ত ব্যক্তিকে বিয়ে করে তবে তারা মায়ের সম্পত্তি পাবে না৷ নকমা বা প্রধান উত্তরাধিকারিনীর যদি কন্যা সন্তান না থাকে বা মারা যায় তাহলে তার যে কোনো বোনের কন্যা সম্পত্তি পাবে৷ কোনো কারণে নকমা মারা যায় এবং জামাই অন্য কোনো বোনকে বিয়ে করে (শ্যালিকা) তাহলে ওই বোনই সেই সম্পত্তির অধিকারিনী হবে৷ কোনো পরিবারে তিনটি কন্যা থাকে এবং নকমার কন্যা সন্তান আছে কিন্তু অন্য কোনো বোনের কন্যা সন্তান নাই বা কোনো সন্তানই নাই তাহলে নকমার কন্যাই অন্য বোনদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে৷

যদি কোনো সন্তান না থাকে তবে ছেলে কিম্বা মেয়ে দত্তক গ্রহণ করতে পারে৷ তবে এ ব্যাপারে সমাজ ও পরিবারের অনুমতি নিতে হয়৷ দত্তক গৃহীত পিতা মাতার সঙ্গে বাস করতে হয়৷ আসল পিতামাতার নিকট কখনই যেতে পারবে না৷ পালিত কন্যা বা ছেলে যদি কিছুদিন থাকার পর চলে যায় তাহলে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে না৷

কোনো স্ত্রী যদি স্বামীকে পরিত্যাগ করে অন্য কারোর সাথে চলে যায়, তাহলে সম্পত্তির উপর তার কোনো অধিকার থাকে না৷ স্ত্রীর যদি কন্যা সন্তান থাকে এবং স্ত্রীর সাথে চলে যায় তাহলে তারও কোনো অধিকার থাকে না৷ কন্যা সন্তান মায়ের সাথে না যায় পিতার সাথে থাকে তাহলে সেই প্রধান উত্তরাধিকারী হবে৷ যতদিন না সে সাবালিকা হয় ততদিন সম্পত্তিসহ পিতার কাছে থাকবে৷ এ রকম ক্ষেত্রে গৃহস্বামী বা স্বামীর কোনো দোষ না থাকে তবে সংসারত্যাগী স্ত্রীর গোত্র তাকে নতুন স্ত্রী এনে দিতে পারে৷ এই নববিবাহিতা স্ত্রী ভাবী নকমা অভিভাবকত্ব করবে৷ এমন অলিখিত আরো অনেক রীতিনীতি আছে৷ বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী উত্তরাধিকার আইন পুরোপুরিভাবে মানা হচেছ না৷ অনেক পরিবারের পিতামাতাই স্থাবর সম্পত্তির অংশ বিশেষ পুত্রদের দিয়ে দিচেছন৷

তঞ্চঙ্গ্যা
পার্বত্য চট্টগ্রামে তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে সাতটি দল রয়েছে৷ দলগুলো মোগছা, কার্বোয়া গছা, ধন্যাগছা, মংলাগছা, লংলাগছা৷ তঞ্চঙ্গ্যারা পিতৃপ্রধান পরিবারের লোক৷ পিতার সূত্র ধরে তাদের গোষ্ঠী বা বংশ পরিচয় নির্ণয় করা হয়৷ পরিবারে পিতার পরে মাতা ও জৈষ্ঠ্য পুত্রের স্থান৷

লুসেই, পাংখুয়া ও বম
পার্বত্য চট্টগ্রামে এদের বসবাস৷ পিতৃপ্রধান পরিবারের লোক৷ পিতাই হলো পরিবার প্রধান৷ পিতার পরিচয়ে বংশ গণনা করা হয়৷

খাসি
বৃহত্তর সিলেটে বসবাস৷ খাসিরা মাতৃতান্ত্রিক৷ মাতার সূত্র ধরে তাদের দল ও গোত্র পরিচয় নির্ণয় করা হয়৷ সর্ব কনিষ্ঠা কন্যাই পরিবারের অধিকাংশ সম্পত্তির উত্তরাধিকারিনী হয়ে পরিবারের দায়িত্ব পালন করে৷
মারম
পিতা পরিবার প্রধান হলেও পারিবারিক কাজকর্মে মাতা উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করে৷ সামাজিক জীবনে মহিলাদের গুরুত্বের কারণে খালাতো ভাই বোনদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ, পিতামাতার পরে ছেলেমেয়েদের স্থান৷

ত্রিপুরা  
ত্রিপুরারা পিতৃপ্রধান পরিবারের লোক৷ পিতা প্রধান, তারপর মাতা ও জৈষ্ঠ্য পুত্রের স্থান৷ একমাত্র ত্রিপুরা সমাজেই বেশ কয়েকটি গোত্রে দ্বিধারায় বংশ গণনা করার রীতি প্রচলিত আছে৷ একজন পুত্র তার পিতার দফা ও গোষ্ঠীর অধিকারী হলেও অনুরূপ একজন কন্যা তার মায়ের দফা ও গোষ্ঠীর অধিকারী হয়ে থাকে৷ এ ব্যাপারে মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা লিখেছেন যে গোত্রে ছেলেরা পিতার বংশ এবং মেয়েরা মাতার বংশ অনুসরণ করে৷ অর্থাৎ ছেলেরা পিতার সম্পত্তি এবং মেয়েরা পায় মায়ের সম্পত্তি ৷

উন্নয়ন পরিকল্পনায় আদিবাসী নারী
আদিবাসী নারীদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন সংস্কৃতি ও সমাজে তাদের অবস্থা ও অবস্থান নিয়ে তথ্যবহুল আলোচনা করার মূলত দুটি উদ্দেশ্য, প্রথমত আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুদের জন্য কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা করার সময় যেন তাদের ভিন্নতা, বৈচিত্র্যসমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা হয়৷ দ্বিতীয়ত এই সমাজ থেকে শিক্ষা নিতে হবে৷ কারণ আদিবাসী সমাজে সাধারণভাবে নারীরা অনেক বেশি স্বাধীন৷ সাধারণভাবে কোনো আদিবাসী পুরুষ কোনো আদিবাসী নারীকে নির্যাতন করে না৷ বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, বর্তমানে এইসব গোষ্ঠীর নারী যে নির্যাতনের শিকার হচেছ সেটা ঘটছে অন্য সমাজের (বাঙালি জনগোষ্ঠী) পুরুষদের দ্বারা৷ যেমন দেখা গেছে, যেসব গোষ্ঠীতে মেয়েরা সম্পত্তির মালিক হয় তাদেরকে বাঙালি সমাজের পুরুষরা ভুলিয়ে অথবা জোরপূর্বক বিয়ে করে সম্পত্তির লোভে৷ পরে নির্যাতন করে তাড়িয়ে দেয় অথবা হত্যা করে৷ তবে আদিবাসীদের নিজস্ব সমাজে বাঙালিদের মতো নারী নির্যাতন প্রচলিত নয়৷ নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে খুঁজতে হবে আদিবাসী সমাজের নারীর এই অবস্থানের মূলমন্ত্র৷ যে মন্ত্রের কারণে ঐ সমাজের পুরুষ নারীদের সাথে সকল কাজে অংশগ্রহণ করে৷ কিন্তু অত্যাচার নির্যাতন করে না৷ যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা করার সময় খুবই সতর্কভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেন তথাকথিত উন্নয়নের নামে আদিবাসী সমাজের অনন্য বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র্য হারিয়ে না যায়৷ উন্নয়ন ঘটাতে গিয়ে যেন আমাদের সমাজের ভয়ঙ্কর অমানবিক অভ্যাসগুলো আদিবাসী সমাজে আরোপিত না হয়৷ এবার ফিরে আসি এই প্রবন্ধের শুরুর কথায় ”নারী ও কন্যাশিশুর উন্নয়নে বিনিয়োগ৷ এই স্লোগানের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের সকল সুবিধাবঞ্চিত ‘নারী ও কন্যাশিশুর’ উন্নয়নের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা করতে হবে এবং বরাদ্দ বাড়াতে হবে৷ আদিবাসী নারীদের জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনায় যে বিষয়গুলো উঠিয়ে নিয়ে আসতে হবে সেগুলো হচেছ:

(১) আদিবাসী নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আর্থিক সেবাসমূহে তাদের অভিগম্যতা তৈরি করতে হবে৷ যেমন ঋণ ও সঞ্চয় প্রকল্প৷ তবে আদিবাসী নারীদের স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী পেশা প্রসারের লক্ষ্যেই এসব রাষ্ট্রীয় আর্থিক সেবা প্রদান করা উচিত৷
(২) আদিবাসীদের তৈরি পণ্যসমূহের সঠিক বিপণনের ব্যবস্থা করা৷ এজন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য আদিবাসীদের পণ্যকে উৎসাহিত করতে হবে৷
(৩) আদিবাসী তথা এই সমাজের নারীদের অবস্থা ও অবস্থান বিষয়ক তথ্য তুলে ধরে প্রবন্ধ, শিক্ষা উপকরণ তৈরি করতে হবে৷ শিক্ষা উপকরণ ও জাতীয় পাঠ্যসূচিতে আদিবাসী বিষয়ক রচনা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন৷
(৪) আদিবাসী নারীদের চাহিদা, স্বার্থ ও জরুরি প্রয়োজনসমূহ সকল জাতীয় নীতিমালাসমূহে অন্তর্ভুক্ত করা৷

সর্বোপরি আদিবাসী নারী-পুরুষের মানবাধিকার রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে৷
 

 

 

     

National Girl Child Advocacy Forum

Contact Us

3/7 Asad Avenue Mohammodpur, Dhaka-1207

Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975, Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net