| Main Links |
| |
|
standing Committee of Forum |
| |
|
Recent |
|
|
|
পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও নারী-পুরুষ
সম্পর্কের বানিজ্যিকীকরণ
তপতী সাহা* |
|
|
নাগরিক আলো আর প্রাকৃতিক অন্ধকারের মাঝে এই মহানগরীর কোন এক
ফুটপাতের ওপর দিয়ে নিঃসঙ্গ একজন নারী হেঁটে চলেছে। কে এই নারী?
অত্যন্- পরিচিত এই দৃশ্য। না, প্রেমিকের জন্য অপেক্ষারত কোন
প্রেমিকা সে নয়। সান্ধ্য ভ্রমণরত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত
পরিবারের কোন নারী সে নয়। এই নারীর শ্রেণিগত অবস্থান নির্ধারণ
করা কঠিন। কারণ সে কোন পবিত্র পরিবারভুক্ত নয় এবং কোন পুরুষের
স্ত্রী, মেয়ে বা বোন নয়। সমাজে নারীদের শ্রেণিগত অবস্থান
নির্ধারিত হয় পুরুষের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে। আপাতত থাক এই
বিশ্লেষণ, আমরা ফিরে যাই সেই নারীর কাছে যে আসন্ন সন্-ান
সম্ভবনার পরিপূর্ণ চিহ্ন শরীরে ধারণ করে, সমস্- যন্ত্রণার
দায়ভার বহন করে অন্ধকার ফুটপাতে হেঁটে বেড়াচ্ছে সেই পুরুষের
সন্ধানে, যে পুরুষ যুগ যুগ ধরে নিজের বহুগামিতা চরিতার্থ করার
হাতিয়ার হিসেবে তাকে ব্যবহার করে চলেছে। যে পুরুষ নিজের পতিত
চেহারা আড়াল করার জন্য তাকে পতিতা নামে সংজ্ঞায়িত করেছে।
এই নগরীর রাতের ফুটপাত বা অলি-গলির অত্যন্ত পরিচিত এই দৃশ্যপট।
অনেকের কাছে মনে হতে পারে, এতে বিস্মিত হওয়ার কি আছে? এই বিষয়
নিয়ে এত কথার অবতারণার দরকারই বা কি? যে যাই বলুক বা যত সাধারণ,
দৈনন্দিন ঘটনাই হোক, সেদিন ফুটপাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা
গর্ভবতী সেই নারীকে দেখে আমার মস্তিস্কের কোষে হঠাৎ এক
বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সেই মুহূর্তে প্রথমেই মনে হয়েছিল, এই নারী যদি
কোন মধ্যবিত্ত অথবা উচ্চবিত্ত পুরুষের আইনসম্মত স্ত্রী হত,
তাহলে কি তাকে গর্ভবতী অবস্থায় অন্ধাকারে অর্থোপার্জনের জন্য
এভাবে হাঁটতে হতো? অবশ্যই না। বরং পুরুষের বংশ রক্ষার
ধারক-বাহক হিসেবে কোন এক সুসজ্জিত শয়নকক্ষে তার স্থান হতো।
চারপাশে থাকতো দামী খাবার ও ঔষধের ছড়াছড়ি।
অন্যদিকে তার সন্-ানের পিতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আসন্ন
সন্তানটি যেন ছেলে হয় এই কামনায় দু’হাত তুলে প্রার্থনায় রত
থাকতো। হয়তো এই পরিবারের কর্তব্যপরায়ণ পুরুষটিই অন্ধকারে
অপেক্ষারত সেই দেহজীবী নারীর সন্তানেরও জনকা। দু’জন নারী একই
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একই পুরুষের সন্তান গর্ভে ধারণ করেছে। অথচ
দু’জনের পরিচয় ভিন্ন। শুধুমাত্র পুরুষের ইচ্ছা ও স্বার্থের
ভিত্তিতে দু’জন নারীর সামাজিক অবস্থান ভিন্ন হয়ে যায়।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অভিধান অনুযায়ী কখনও পতিতা,
কখনও দেহজীবী বা পুঁজিতান্ত্রিক প্রগতিশীলতায় যৌনকর্মী নামে
এদেরকে চিহ্নিত করা হয়। মাঝে মধ্যেই এদের নিয়ে বেশ হৈ-চৈ,
পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি, মানবাধিকার সংস্থার ব্যস্-তা দেখা যায়।
তথাকথিত মধ্যবিত্ত সমাজ বেশ কিছুদিন উত্তপ্ত সময় কাটানোর সুযোগ
পান। কিন্তু যা কিছু করা হোক না কেন সবটাই এই নারীদের
কেন্দ্রবিন্দু করে। অথচ যে পুরুষ যুগ যুগ ধরে বিকৃত কামনা
চরিতার্থ করার জন্য এই পেশা টিকিয়ে রেখেছে সেদিকে কেউ ভুলেও
দৃষ্টিপাত করেন না। এমন কি মূল কারণটিও বিশ্লেষণ করেন না। বরং
এই পেশাকে এবং দেহজীবী নারীদের বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে তুলে
ধরা হয়। অথচ সামগ্রিক অর্থে নারী-পুরুষ সম্পর্কের অসম ও অসুস্থ
রূপের এটি একটি দিক মাত্র। নারীকে যৌনবস্তু হিসেবে ব্যবহারের
ধারাবাহিকতার একটি চরম প্রকাশ হচ্ছে
চৎড়ংঃরঃঁঃরড়হ। বিচ্ছিন্ন
কোন সমস্যা নয়। পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি যার ধারক-বাহক।
যে মুহূর্ত থেকে পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাস শুরু হয়েছে তখন থেকেই
পুরুষের বহুগামিতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করেছে।
ইতিহাসের বিভিন্ন স্-র অতিক্রম করে মানুষের সম্পর্কের অনেক বদল
ঘটেছে। সমাজে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটলেও পুরুষের বহুগামিতা
চর্চার ক্ষেত্রে কোন ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে নি। বরং বিভিন্ন
তত্ত্ব ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে,
দেয়া হয়েছে আইনসম্মত রূপ। এই বিষয়টির উৎস অনুসন্ধানের জন্যই এই
লেখা। যদিও এই অনুসন্ধানের সামনে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে
মহানগরীর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নারী।
ইতিহাস কি বলে?
পুরুষতন্ত্র বা নারীর অধঃস্-নতার ঐতিহাসিক কারণ অনেকেরই জানা
আছে। বহুগামিতা কি পুরুষতন্ত্রের একটি প্রকাশ? নাকি এই ধরনের
বিকৃতির জন্য বিশেষ কোন কারণ দায়ী? তাছাড়া পুরুষদের মধ্যেই বা
কেন এর জন্ম হলো। এর কি কোন আলাদা প্রেক্ষিত আছে? নাকি
পুরুষতন্ত্রের উৎসের সঙ্গেই এটি জড়িয়ে পেঁচিয়ে আছে। অনেক
নারীবাদী গবেষক ও নৃতাত্ত্বিক নারী শোষণের ইতিহাস নিয়ে কাজ
করেছেন। তাঁদের গবেষণালব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করলে এর ঐতিহাসিক
কারণ সম্পর্কিত কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
শিকার-সংগ্রহের যুগে শিকারী পুরুষ বনে জঙ্গলে ঘুরে পশু শিকার
করেছে। যার ফলে পশুদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পুরুষের
হয়েছে। এই পর্যবেক্ষণই আরো তীক্ষ্ণ ও শক্তিশালী হয়েছে পশুপালক
যাযাবর সময়ে। এই পর্যায়ে পুরুষ দেখেছে একটি ষাঁড় কিভাবে
অনেকগুলো গাভীকে সন্-ান সম্ভবা করতে পারে। এই পর্যবেক্ষণ
পুরুষকে তার নিজের পুনরুৎপাদন ক্ষমতা সম্বন্ধে ধারণা দিয়েছে।
যার ফলে পশুপালক যাযাবর অর্থনীতির যুগে দুর্বল পশুগুলো মেরে
ফেলে শক্তিশালী পশুগুলোকে রাখা হতো। এই সময় থেকেই একদিকে যেমন
পশুদের মুক্ত বন্য যৌন সম্পর্কের অনুকরণে জবরদস্-িমূলক যৌন
সম্পর্কের উদ্ভব ঘটে। তেমনি অন্যদিকে একজন পুরুষের জন্য অসংখ্য
নারীর প্রচলন শুরু হয়। এভাবে নারীহরণ, ধর্ষণ ও হারেম প্রথার
শুরু হয়। পিতৃসূত্রীয় উত্তরাধিকার প্রথা এই সময় থেকেই স্পষ্ট
রূপ পেতে থাকে। পশুপালক যাযাবর অর্থনীতির একই যুক্তিতে নারীকেও
অস্থায়ী যাযাবর সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়। যাযাবর অর্থনীতির বদল
ঘটেছে, পৃথিবীর ইতিহাস অতিক্রম করেছে অনেকগুলো অর্থনৈতিক
উৎপাদন সম্পর্ক। কিন্তু অনেক পুরুষ আচরণ ও সংস্কৃতিগতভাবে সেই
পশুপালক যাযাবর সমাজের অবস্থানেই রয়ে গেছে। পশুর আচরণ থেকে
আত্মস্থঃ করার অভ্যাস মজ্জাগত করেই পুরুষ নারীর যৌনতা ও
পুনরুৎপাদন ক্ষমতার ওপর প্রভুত্ব স্থাপন করেছে (চধঃৎরধৎপযু ধহফ
অপপঁসঁষধঃরড়হ ঙহ ধ ডড়ৎষফ ঝপধষব নু গধৎরধ গরবং, চ.৬৩)।
বহুগমনের সামাজিক স্বীকৃতি
একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, সমাজ পশুপালনের
ওপর ভিত্তি করে বিকশিত হয়েছে সেখানে বহুগমনের প্রাতিষ্ঠানিক
স্বীকৃতি জোড়ালো ভিত্তি পেয়েছে। যেমন আরব রাষ্ট্রসমূহ, হারেম
এসকল দেশেই প্রচলিত। যা এখনও টিকে আছে। এই সমাজগুলো ইতিহাসের
এক পর্যায়ে শস্য উৎপাদনের চেয়ে পশুপালনের ওপর বেশি নির্ভর করেছে।
যদিও বহু বিবাহ বিভিন্ন সমাজেই স্বীকৃত। একজন পুরুষের একই সময়ে
একাধিক বিবাহ, বহুগমনের একটি সামাজিক ও আইনগত রূপ মাত্র।
পুরুষের উত্তরাধিকার রক্ষার জন্য ঘরের ভেতর স্ত্রী হিসেবে এক
বা একাধিক নারীর প্রয়োজন যে নারীর পুনরুৎপাদন ক্ষমতার ওপর
স্বামী নামক পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার। আবার ঘরের বাইরে পুরুষ
এক নারী গোষ্ঠী তৈরি করেছে, তার শারীরিক চাহিদা চরিতার্থ করার
জন্য। যার নাম দেহজীবী নারী। যদিও এই নারীদের ওপর একজন পুরুষের
একচ্ছত্র অধিকার নেই। সর্বকালে সর্বদেশে পুরুষের বংশরক্ষার
জন্য তথাকথিত সতী নারীর প্রয়োজন হয়েছে অথচ অনেক পুরুষ নিজে
কখনই সৎ থাকার প্রয়োজন অনুভব করে নি। এমনকি এই পুঁজিতান্ত্রিক
বিশ্ব অর্থনীতির যুগেও পুরুষের বহু বিবাহ আইনসম্মত।
নারী কেন যৌনপেশায় নিয়োজিত হয়?
বেশির ভাগ নারী যৌন কাজ বেছে নেয় দারিদ্র্যের কারণে। আবার
অনেকে পরিবারের সদস্য বা দালালের খপ্পরে পরে এই পেশায় আসতে
বাধ্য হয়। সাধারণ ধারণা এই যে, যৌনকর্মীরা তাদের খদ্দেরদের
শোষণ করে। যদিও সেটি ঠিক নয়। বাস্-ব চিত্র এই যে, বিশাল অংশের
নারী অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ
থেকে এটি একটি লাভজনক পেশা। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ব্যাংককে
শিশুযৌনকর্মীদের মাসিক মুনাফা $ ৮০,০০০ এর বেশি। অসংখ্য
স্বার্থান্বেষী মহল কম বয়সী মেয়েদের এই পেশায় জড়িত করে মুনাফা
অর্জন করে। ইন্দোনেশিয়াতে যৌনকর্মীদের বাৎসরিক আয় টঝ $১.১
মিলিয়ন থেকে $৩.৩ মিলিয়ন। থাইল্যান্ডে প্রতি বছর শহর থেকে
গ্রামে যৌনকর্মীরা ৩০০ মিলিয়ন ডলার যোগান দেয়, যা ঐ দেশের
সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দের চেয়েও বেশি। তবে সরকারি পরিসংখ্যান বা
জাতীয় আয়ের কোথাও যৌন খাতের আয়ের কোন স্বীকৃতি নেই।
বেশির ভাগ আইন নৈতিকতার দোহাই দিয়ে যৌনকর্মীদের শাস্-ি
প্রদানের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। লাভজনক হওয়ার কারণে যৌনব্যবসা
ক্রমান্বয়ে বিশ্বব্যাপী ফুলেফেঁপে উঠেছে। কিন্তু এখন পর্যন্-
যৌনকর্মীদের আইনগত স্বীকৃতি ও অধিকার সীমিত। এমনকি তারা তাদের
খদ্দেরদেরকে নিরাপদ কনডম ব্যবহারেও উদ্ধুদ্ধ করতে পারে না।
যেখানে যৌনকর্মীদের শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে সেখানেই কেবলমাত্র
সম্ভব কিছু অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই
যৌনকর্মীদের জন্য কোন সুনিদিষ্ট নীতিমালা নেই। এমন একটি
নীতিমালা করা যেখানে এই নারীদের মানাবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে
হবে ও শিশুদের যৌন পেশায় নিয়োজিত করা নিষিদ্ধ করতে হবে।
কিছুদিন আগে যৌনকর্মীদের জন্য কাজ করতে ফরিদপুরের ঈদ ঘাট
এলাকায় গিয়েছিলাম। সেখান থেকে কিছু কেস স্টাডি সংগ্রহ করি। যার
দু’টি নিম্নরূপ:
কেস স্টাডি
সেলিনা, বয়স ২৮ বছর। বাড়ী মানিকগঞ্জের কোন এক গ্রামে। সঙ্গত
কারণেই গ্রামের নাম প্রকাশ করে নি। ১৪/১৫ বছর বয়সে
পার্শ্ববর্তী গ্রামে মামার বাড়িতে সেলিনা বেড়াতে আসে। সেখানেই
পরিচয় হয় বিজয় নামে একটি ছেলের সঙ্গে। পরিচয় থেকে গভীর প্রেম।
যেহেতু এই প্রেম হয়েছিল ভিন্ন ধর্মের একজনের সঙ্গে তাই দু’জনেই
বুঝতে পারে পারিবারিকভাবে এর সফল পরিণতি সম্ভব নয়। ফলে দু’জনে
মিলে পরামর্শ করে পালিয়ে যাওয়ার। পালিয়ে ভারত যাবে এবং সেখানে
গিয়ে বিয়ে করবে। এভাবেই একদিন সেলিনা মামার বাড়িতে বেড়াতে আসার
নাম করে পারি জমায় অজানার উদ্দেশে। পেছনে পড়ে থাকে তার কৃষক
পিতামাতা ও পাঁচ ভাইবোনের সুখের সংসার। বিজয় তাকে বলেছিল
দৌলতদিয়া ঘাটের একটি নির্দিষ্ট স্থানে চলে আসতে, সেখানে
দু’জনের দেখা হবে। সেলিনা অপেক্ষা করতে থাকে বিজয়ের জন্য।
দীর্ঘক্ষণ পর বিজয়ের দুই বন্ধু এসে বলে ভাবী আমাদের সাথে চলেন।
বিজয় আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছে। সেলিনা সরল বিশ্বাসে তাদের সাথে
দৌলতদিয়া ঘাটের একটি বাড়িতে এসে ওঠে। কিন্তু বিজয়ের দেখা পায়
না। দুশ্চিন্-া ও উৎকন্ঠা নিয়ে কেটে যায় ৩/৪ দিন। দেখা মেলে না
তার কাঙিক্ষত জনের। ক্রমশ সব কিছু পরিষ্কার হয়। যখন এ বাড়ির
সর্দারনী মহিলা বলে, সেলিনা বিক্রি হয়ে গেছে। মাথায় আকাশ
ভেঙ্গে পরে। বন্ধ হয়ে যায় তার ফেরার পথ। সর্দারনী তাকে টাকা
দিয়ে কিনে নিয়েছে। ফলে কিছুতেই বের হতে দেয় না। এভাবেই সে
বাধ্য হয় যৌনকর্মীর পেশা বেছে নিতে।
কিছুদিন পর সেলিনার মা-বাবা খোঁজ পেয়ে দেখা করতে আসে। মা অনেক
কান্নাকাটি করলেও বাবা বলে ফিরে যাওয়ার পথ বন্ধ। সেলিনা নিজেও
প্রচণ্ড অভিমানে আর ফিরে যেতে চায় নি। পরবর্তীতে সেলিনার ভাইরা
বিজয়ের নামে মামলা করে। তার জেল হয়। কিন্তু সেলিনা একজন
গৃহিণী, কৃষাণী বা সমাজের সুন্দর নাগরিক না হয়ে পরিণত হয়
যৌনকর্মীতে। তারপর কেটে গেছে ১৪/১৫ বছর। এখন সে নিজেই বাসা
ভাড়া নিয়ে স্বাধীনভাবে যৌনকাজ করে। বাধা বাবু আছে। সে খুলনায়
কাজ করে। বর্তমানে সেলিনা তার গ্রামের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ
রাখে। মাঝে মাঝে বাড়ি যায়। বাবা মারা গেছে। গ্রামের অন্য
লোকেরা জানে সেলিনার এখন বিয়ে হয়েছে, ঘর-সংসার করে। তার বাধা
বাবু মাঝে মাঝে সেলিনার বাড়িতে আসে স্বামীর পরিচয়ে। সেলিনা তার
ভাইয়ের সংসারে টাকা দেয়। কারণ ভাইয়েরা মাকে ভরণপোষণ দেয় না।
তাই সেলিনাকেই পরিচয় গোপন করে মায়ের ভরণপোষণ করতে হয়। সমাজে
তার জায়গা না হলেও দায়িত্ব থেকে রেহাই পায় নি সে।
কেস স্টাডি
আসমার বয়স, বলেছিল ১৫ বছর। দেখে মনে হয় কম হবে। কথা বলার ভঙ্গী
শিশুসুলভ। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর এলাকায় অতিদ্ররিদ্র পরিবারের
সন্-ান। সংসারে সৎ মা। অভাব আর সৎ মায়ের নির্যাতন সহ্য করতে না
পেরে ঢাকায় চলে আসে। ঢাকায় এসে কত রকমের কাজ করেছে। কিন্তু
কখনই ভাবে নি যৌন কাজ করে অর্থোপার্জন করা যায়। এমনকি ৭/৮ দিন
অভূক্ত থেকেছে। মিরপুর মাজারে খিচুরী খাওয়ার লোভে বসে থাকতো। এ
রকম অবস্থায় একদিন এক লোক কাজ দেয়ার কথা বলে মাদারীপুর নিয়ে
আসে। সেখানে ২০০০ টাকার বিনিময়ে সর্দারনীর কাছে বিক্রি করে
দেয়। এখন নাজমা একজন ‘ছুকরী’। ‘ছুকরী’দের কোন স্বাধীনতা থাকে
না। কারণ তারা সর্দারনীর ঘরে থাকে। তাদের সমস্- আয় সর্দারনী
নিয়ে নেয়। এমনকি তাদের বিশ্রাম, খাওয়া পড়া, সকল কিছু সর্দারনী
নিয়ন্ত্রণ করে। দিনে ১২/১৩ জন লোককেও সঙ্গ দিতে হয়। বেশির ভাগ
লোকই কনডম ব্যবহার করতে চায় না। শারীরিক অত্যাচার করলেও
প্রতিবাদ করা যায় না। এমনকি যদি কোন লোক ভালোবেসে বখশ্িস দেয়
সে টাকাও সর্দারনী নিয়ে নেয়। আসমা বলে “যৌন কাজ করেও পেট ভরে
ভাল খাবার খেতে পাই না। একটা ভাল জামা পরতে পারি না। মাঝে মাঝে
মনে হয় বিষ খাই।’
এরকম আরো অনেক কেইস স্টাডি সংগ্রহ করেছিলাম। যার প্রতিটিই
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অবিচার, বঞ্চনা ও শোষণের প্রতিচ্ছবি।
শুধ্ুই কি পুরুষ?
পুরুষই কি শুধু যুগ যুগ ধরে শারীরিক ও মানসিক বহুগমনের চর্চা
টিকিয়ে রাখার জন্য যৌনপেশাকে উৎসাহিত করছে? নারীদের কি
এক্ষেত্রে কোন ভূমিকা নেই? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়,
প্রথমত, সমাজ কখনোই নারীর বহুগমনকে স্বীকৃতি দেয় নি, ব্যক্তিগত
সম্পত্তির উত্তরাধিকার রক্ষার জন্য। দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিকভাবেই
নারী আত্মস্থঃ করেছে সৃষ্টিশীলতা, দায়িত্ব ও নিষ্ঠার সামাজিক
চর্চা, ফলে বহুগামিতার চর্চা সমষ্টিগত অর্থে নারী কখনই করে নি।
তবে বিচ্ছিন্ন উদাহরণ থাকতে পারে, যা গোটা নারী সমাজকে
প্রতিনিধিত্ব করে না।
তবে একটি বিষয় সত্যি যে, নারী অনেক সময় পুরুষের বহুগমন চর্চার
ক্ষেত্রে সহায়তা করে। যেমন মনত্ত্বাতিক বা আর্থ-সামাজিক কারণ
যাই হোক কোন কোন পরিবারের নারী সদস্যরা পুরুষের এই দিকটি দোষের
চোখে দেখেন না। এই নারীরা পুরুষতন্ত্রের সুবিধাভোগী শ্রেণি।
অবশ্যই মনে রাখতে হবে, নারীর সহায়তা ছাড়া পুরুষতন্ত্র টিকে
থাকতে পারে না।
মনোজাগতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন
দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় পুরুষের মনোজগত গড়ে উঠেছে নারীর
যৌনতাকে পণ্য করে। নারীকে অসম অংশীদার হিসেবে ধরে নেয়ার ফলেই
তার দেহ ও মন কখনই এই সমাজের কাছে মর্যাদা পায় নি। তাই
কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রয়োজন পুরুষের সংস্কৃতিগত
উত্তরণ। বিলুপ্ত করতে হবে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা, তা
না হলে পুরুষতন্ত্রের ইতিহাস কখনই মানুষের ইতিহাসে পরিণত হবে
না। আর যুগ যুগ ধরে সন্ধ্যার অাঁধারে দাঁড়িয়ে ঐ নারী অপেক্ষা
করবে শিকারী পুরুষের জন্য। কিন্তু মানুষের সম্পর্কের এই
বহুমাত্রিক বাণিজ্যকীকরণ বন্ধ করতে হলে নারী হিসেবে নয়, পুরুষ
হিসেবেও নয়, মানুষ হিসেবে ঐ নারীর কাছে যেতে হবে। তার হাজার
বছরের অপেক্ষার শেষে সম্মিলিতভাবে বলতে হবে, আজ থেকে শুরু হোক
মানুষের ইতিহাস। এই মানবিক ইতিহাসের পথ ধরে এগিয়ে যাবে আমাদের
কন্যাশিশুরা। একটি সুস্থ, সুন্দর বৈষম্যহীন সমাজের দিকে, যা
কিনা আমাদের সবার একান্- চাওয়া।
সহায়ক গ্রন্থ
১. গধৎরধ গরবং, চধঃৎরধৎপযু ধহফ অপপঁসঁষধঃরড়হ ড়হ ধ ডড়ৎষফ ঝপধষব
ডড়সধহ রহ ঃযব ওহঃবৎহধঃরড়হধষ উরারংরড়হ ড়ভ খধনড়ঁৎ. তবফ ইড়ড়শং
খঃফ.-১৯৮৬.
২. গধৎী, ক ধহফ ঊহমবষং, ঋ. ঝবষবপঃবফ ড়িৎশং, ঠড়ষঁসব ওওও,
চৎড়মৎবংং চঁনষরংযবৎং, ১৯৭০.
৩. কমলা ভাসীন, ১৯৯৩: পিতৃতন্ত্র কাকে বলে? |
|
|
|
|
|
National
Girl Child Advocacy Forum |
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |
|