|
|
‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’- কথাটা সত্যি
নয়, তাই প্রমাণ করলেন পাবনা জেলার শ্যামপুর টাটী গ্রামের মেয়ে
জেসমিন৷ পুরো নাম মোছাম্মত জেসমিন বেগম৷ এই অভাব বা দারিদ্র্যকে
জয় করে তিনি এখন একজন স্বাবলম্বী মানুষ৷ জেসমিন বেগম ষাট দশকের
মাঝামাঝি সময়ে এক গরিব কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করে৷ ছয় বোন ও
তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়৷ পরিবারে সচছলতা বলতে তেমন কিছু
ছিল না৷ কারণ পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় জমি ছিল
অপ্রতুল৷ তার উপর জমিগুলো দিনের পর দিন বিলীন হয়ে যাচিছল
নদীগর্ভে৷ এতে দারিদ্র্য আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে জেসমিনের
পরিবারকে৷ সমস্যা প্রতিদিনই বাড়তে থাকে৷ তাই এ অবস্থায়
জেসমিনের লেখাপড়ার জন্যে তার মামা তাকে রাজবাড়ির বেড়াডাঙায়
নিজের বাড়িতে নিয়ে যান৷ সেখানে জেসমিন পুনরায় স্কুলে ভর্তি হন৷
পড়াশুনায় জেসমিন খুব ভালো ছিলেন৷ ক্লাসে সব সময় প্রথম হতেন৷
শিক্ষকরা জেসমিনকে খুব ভালোবাসতেন৷ কিন্তু তিনি যখন সপ্তম
শ্রেণির ছাত্রী ঠিক তখনই তার বাবা বিয়ের আয়োজন করেন৷ মাত্র ১৫
বছর বয়সে স্কুল শিক্ষক মনির হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়৷
স্বামীর উপার্জনে কোনো রকমে জীবন চলছিল৷ কিন্তু সেই সুখও তাদের
বেশি দিন টিকল না৷ কারণ তাদের সন্তানের সংখ্যা যখন দু ছেলে এবং
এক মেয়ে ঠিক তখনই জেসমিনের স্বামী এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে
আক্রান্ত হন৷ স্বামীর আয় প্রায় বন্ধের দিকে৷ তাদের নিজস্ব জমি
যা ছিল তা দিয়ে সংসার কোনো রকম চলতে থাকে৷ তবে তাদের একটি নৌকা
ছিল৷ সেটি ভাড়া দিয়েও কিছু আয় হতো৷ কিন্তু তাদের আয়ের অধিকাংশ
টাকা স্বামীর অসুখের পেছনে খরচ হয়৷ এভাবে চলতে গিয়েও নিয়তি মেনে
নিলো না৷ তাদের যে আবাদি জমি ছিল তা এ পর্যায়ে যমুনার গর্ভে
বিলীন হয়ে যায়৷
এমন অবস্থায় জেসমিন অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আসেন৷
কিছুদিন পূর্বে তার বাবা মারা যাওয়ায় জেসমিন ভাইয়ের সংসারে ওঠে৷
সেখান থেকে কিছুটা সামলে উঠতেই জীবনে নেমে আসে এক আকস্মিক
বিপর্যয়৷ তার স্বামীর মৃত্যু ঘটে৷ সন্তানদের নিয়ে জেসমিন খুবই
অসহায় বোধ করেন৷ ভাইয়ের সংসারে থেকে নৌকাভাড়া হিসেবে যে
সামান্য টাকা পেতেন, তা দিয়ে সংসার কোনো মতে চলতে থাকে৷ ভাই
তাকে অনেক সাহায্য সহযোগিতা করতেন৷ ছেলেদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে
দিলেন৷ কিন্তু জেসমিনের ভাইটিও কিছুদিন পর মারা যায়৷
অভিভাবকহীন জেসমিনের পথ চলা শুরু হয়৷ এক রকম অনিচছায় তিনি
পাবনায় এসে ১৯৯৯ সালে সেলাইয়ের উপর প্রশিক্ষণ নেন৷ সেখান থেকে
ফিরে বাড়িতে স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু করেন৷ বাড়ির আশেপাশেই তিনি
কাজ করতেন৷ মনে মনে ভাবেন, এ কাজকে আরো বাড়ানো যায় কিনা৷ ঠিক
তখনই একটি ঘটনা ঘটে৷ তিনি ৭৪৬তম ব্যাচে উজ্জীবক প্রশিক্ষণে
অংশগ্রহণ করেন৷ প্রশিক্ষণে জ্ঞানের রাজ্য, আদর্শ গ্রাম এবং
নারীর ক্ষমতায়নের অংশটি জেসমিনকে খুবই আকৃষ্ট করে৷ প্রশিক্ষণ
গ্রহণের পর পরই জেসমিন যেন বদলে যান৷ নিজের মধ্যে এক নতুন শক্তি
আর আত্মবিশ্বাস অনুভব করতে থাকেন তিনি৷ জেসমিন মনস্থির করেন,
এমন একটা কিছু করবো যা শুধু নিজের উন্নয়নই ঘটাবে না, পাশাপাশি
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে৷ এ
লক্ষ্যেই জেসমিন একটি সমিতি প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন, যার
মধ্যে দিয়ে নারীদের আর্থিক সাহায্য প্রদান ও আত্মনির্ভরশীল করা
তোলা সম্ভব হবে৷ বিষয়টি নিয়ে তিনি এলাকার উজ্জীবকদের সাথে
আলোচনা করেন৷ তারা সবাই সমিতি করার বিষয়ে একমত প্রকাশ করেন এবং
পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শ্যামলী মহিলা সমিতি’৷
সমিতির সকল কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সাধারণ
কার্যনির্বাহী কমিটি রয়েছে৷ তবে সমিতির কোনো সদস্যেরই কোনো
বিশেষ পদমর্যাদা নেই৷ এখানে সবার মতামতের ভিত্তিতে সমিতির সকল
কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়৷ এই সমিতির বর্তমান সদস্য
সংখ্যা ৩০ জন৷ এখানে অধিকাংশ সদস্যই উজ্জীবক৷ তবে এখনও সমিতির
নিজস্ব কোনো অফিস তৈরি হয়নি৷ আর তাই সমিতির সভা, বৈঠক বা যে
কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় জেসমিনের বাড়িতে বসে৷ সাধারণত এই সভা
বা বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয় প্রতিমাসের প্রথম সপ্তাহে৷ এতে সমিতির
সকল সদস্য উপস্থিত থাকেন৷ জেসমিন সমিতিতে মাসিক চাঁদার ব্যবস্থা
করেন৷ এতে করে তাদের সঞ্চয় বাড়তে থাকে৷ এক পর্যায়ে ক্ষুদ্রঋণ
কর্মসূচি শুরু করে সমিতি৷
জেসমিন এই সমিতির মাধ্যমে শুধুমাত্র দরিদ্র বিত্তহীন মহিলাদের
নয়, এলাকার সকল দরিদ্র ও ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষের উন্নয়ন করে
চলেছেন৷ আর সেজন্যই এ সমিতি থেকে এলাকার প্রায় সকল শ্রেণির
মানুষই তাদের নানা প্রয়োজনে সহযোগিতা দিয়ে থাকে৷ এই সমিতির
প্রধান কাজ হল, এলাকার দরিদ্র মানুষদের টাকা সঞ্চয় এবং তাদের
ঋণ প্রদান করা৷ সদস্যরা প্রতিমাসে ৫০ টাকা করে সমিতির তহবিলে
জমা দেন৷ তারা সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে সেলাই মেশিন ক্রয়, মুদির
দোকান, ব্লক-বাটিকের কাজ ইত্যাদি আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের
মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হন৷ সমিতি থেকে এ পর্যন্ত যারা ঋণ
নিয়েছেন তারা আজ সবাই স্বাবলম্বী৷
জেসমিন মনে করেন, আজও বাংলাদেশের নারীরা সকল ক্ষেত্রে বৈষম্যের
শিকার, তাই তিনি এলাকার দরিদ্র ও দুস্থ মহিলাদের নিয়ে দু মাসে
একটি সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন৷ তিনি ৩০ জন করে মোট দুটি
প্রশিক্ষণে ৬০ জনকে প্রশিক্ষণ দেন৷ কারণ তিনি মনে করেন,
শুধুমাত্র ঋণের মাধ্যমে একজন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হতে পারে
না৷ এর পাশাপাশি সেই দরিদ্র ব্যক্তিটি যদি হাতে কলমে আরো দক্ষ
হয়, তবেই প্রকৃত অর্থে তার ভাগ্যের উন্নয়ন ও পরিবর্তন হওয়া
সম্ভব৷ পাশাপাশি জেসমিন মেয়েদের শিক্ষিত এবং লেখাপড়ার প্রতি
আগ্রহী করে তোলার জন্য নানা ধরনের প্রচারণা চালান৷ এছাড়াও
স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন
কর্মসূচিসহ নানা ধরনের সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কাজে নিজে
অংশগ্রহণের পাশাপাশি এলাকার অন্যদেরও অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেছেন৷
জেসমিন নিজে দর্জির কাজের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন৷ হাঁস-মুরগি
ও ছাগল পালন করে মাসে ৫০০০ টাকার বেশি রোজগার করেন৷ তিনি এখন
শুধু স্বাবলম্বীই নন, তিনি সুখী৷ তাকে এখন সংসার চালাতে অন্যের
দ্বারস্থ হতে হয় না৷ তার এ পর্যন্ত আসার জন্য দি হাঙ্গার
প্রজেক্টকে কৃতজ্ঞতা জানান৷ তিনি বলেন, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট
তাকে নতুন জীবন শুরু করতে অনুপ্রাণিত করেছে৷ জেসমিন এখন নতুন
করে স্বপ্ন দেখেন, তার প্রিয় বাংলাদেশ একদিন দারিদ্রের কবল থেকে
মুক্ত হয়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে৷
|
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |