প্রকাশ্যে রাস্তায় শ্লীলতাহানি

18-11-12prothom-alo-logo
অপমান সইতে না পেরে কলেজছাত্রীর আত্মহনন
সোনারগাঁ প্রতিনিধি | তারিখ: ১৮-১১-২০১২
শ্লীলতাহানির অপমান সইতে না পেরে গতকাল শনিবার নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার চরগোয়ালদী গ্রামের কলেজছাত্রী ফারহানা ইসলাম রিমি আত্মহত্যা করেছে। এর আগে শামীম মিয়া (৩১) নামের স্থানীয় এক যুবক প্রকাশ্যে তার শ্লীলতাহানি করেন।ফারহানা উপজেলার চরগোয়ালদী গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলামের মেয়ে। সে সোনারগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিল।
শামীম মিয়ার বাড়িও চরগোয়ালদী গ্রামে। তিনি ঢাকার একটি ওষুধ কোম্পানিতে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেন। শামীম এর আগেও ফারহানাকে নানাভাবে প্রস্তাব দেন ও হয়রানি করেন। বছর খানেক আগে তাকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা ও হামলা করলে সালিসে শামীমকে জরিমানা ও জুতাপেটা করা হয়।এলাকাবাসী, পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, ফারহানা গতকাল সকালে প্রাইভেট পড়তে কলেজের পাশে এক শিক্ষকের বাড়িতে যাচ্ছিল। এ সময় সোনারগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে তার পথরোধ করে প্রেমের প্রস্তাব দেন শামীম। এতে সাড়া না দেওয়ায় তিনি ফারহানার শ্লীলতাহানি করেন। একপর্যায়ে তার ওড়না, মুঠোফোন ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেন। এ সময় ফারহানার চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে শামীম পালিয়ে যান। পরে স্থানীয় এক মুরব্বি তাঁর নাতনির একটি ওড়না ফারহানাকে দেন। এরই মধ্যে ওই পথে পড়তে যাওয়া ফারহানার কয়েকজন বান্ধবী সেখানে উপস্থিত হয়।


বান্ধবীদের একজনের মুঠোফোন নিয়ে ফারহানা তার ছিনিয়ে নেওয়া মুঠোফোনে শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফোনসেট ও ওড়না দিতে অনুরোধ করে। শামীম সেগুলো দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফারহানা আত্মহত্যার হুমকি দেয়। মুঠোফোনের কথোপকথনের রেকর্ড থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
এরপর ফারহানা বান্ধবীদের বিদায় দিয়ে পাশে কাজ আছে বলে চলে যায়। এর কিছুক্ষণ পর ফের ঘটনাস্থলেই বিষপান করা অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এরই ফাঁকে ফারহানা স্থানীয় বাজার থেকে কীটনাশক কিনে তা পান করে।


স্থানীয় লোকজন জানান, এলাকার কয়েকজন ফারহানাকে প্রথমে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কীটনাশক পান করার আগে ফারহানা তার মৃত্যুর জন্য শামীমকে দায়ী করে একটি চিরকুট লিখে যায়।


ফারহানার বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, শামীম কয়েক বছর ধরে তাঁর মেয়েকে প্রেম ও বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এতে রাজি না হওয়ায় তিনি গত বছরের জুলাইতে তাঁর বাড়িতে এসে ফারহানাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। স্বজনেরা বাধা দিলে শামীম তাঁদের মারধর করেন। পরে গ্রাম্য সালিসে তাঁকে ৫০ বার জুতাপেটা করা হয়। এ ছাড়া তাঁকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়।
চরগোয়ালদী গ্রামের বাসিন্দা ও সালিসকারীদের একজন মাহফুজুর রহমান জানান, প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় শামীম ফারহানাকে বাড়ি থেকে তুলে আনতে যান এবং না পেরে আত্মীয়স্বজনকে মারধর করেন। এ ঘটনায় সালিস ডেকে শামীমকে জরিমানা করা হয়। এ সময় তাঁকে জুতাপেটা করা হয়। তবে ফারহানার বাবা তাঁর জরিমানার টাকা মাফ করে দেন। এর পরও তিনি এত বড় ঘটনা ঘটালেন। তিনি শামীমের শাস্তি দাবি করেন।


এদিকে শামীমের শাস্তির দাবিতে ফারহানার সহপাঠী ও এলাকাবাসী গতকাল দিনভর বিক্ষোভ করেছে। ক্লিনিক থেকে ফারহানার লাশ বাড়িতে নেওয়ার পর হাজারো মানুষ ও তার সহপাঠীরা সেখানে ভিড় করে।


খবর পেয়ে সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। শামীমকে গ্রেপ্তারের জন্য তাঁর বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি।
পুলিশ ফারহানার লেখা একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে। সেখানে লেখা আছে, ‘আমার মৃত্যুর জন্য একমাত্র শামীম দায়ী।’
ওসি হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি, লেখাটি ফারহানার।’ তিনি জানান, ময়নাতদন্তের জন্য ফারহানার লাশ নরসিংদী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
সোনারগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ আশরাফুজ্জামান বলেন, ফারহানা নম্র, ভদ্র ও মেধাবী ছাত্রী ছিল।


গতকাল শামীমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরে তালা দেওয়া।
এ ঘটনায় ফারহানার ভগ্নিপতি হাবিবুর রহমান নারী নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে শামীম ও তাঁর বড় ভাই শাহজালালকে আসামি করে সোনারগাঁ থানায় মামলা করেছেন।

তথ্যসূত্র: প্রথমআলো, ১৮ নভেম্বর ২০১২

Advertisements