উদযাপিত হলো জাতীয় কন্যাশিশু দিবস ২০১৩

_DSC0026‘শিশু কন্যার বিয়ে নয়- করবে তারা বিশ্ব জয়’ – এই শ্লোগানকে সামনে রেখে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের উদ্যোগে সকাল ৯.০০ টায় জাতীয় জাদুঘর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের হয়। বেলুন উড়িয়ে র‌্যালির উদ্বোধন করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মেহের আফরোজ চুমকী এমপি। র‌্যালিটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে অবস্থান নেয়।
এরপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে মহিলা ও শিশু অধিদপ্তর ও জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের যৌথ উদ্যোগে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন শ্লোগান সম্বলিত ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধি, জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সদস্য, শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীসহ প্রায় দু হাজার জন স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আজকে নারীরা উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাক, একটি বিশেষ গোষ্ঠী তা চায় না। তারা ১৩ দফার মাধ্যমে নারীদের ঘরের ভিতর আবদ্ধ করে রাখতে চায়। এমনকি নারীদের সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছেন তারা। তাই সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের রুখে দেওয়ার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে। সকাল ১০.০০টায় শুরু হওয়া এ মানববন্ধন কর্মসূচি শেষ হয় সকাল ১০:৩০টায়। _DSC0249মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে সকাল ১১.০০টায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রাঙ্গনে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম’র সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার -এর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপসি’ত ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মেহের আফরোজ চুমকী এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপসি’ত ছিলেন জনাব তারিক-উল ইসলাম- মাননীয় সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জনাব শেখ আব্দুল আহাদ- চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, জনাব মিলি বিশ্বাস- অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি (ট্রাফিক)। এ ছাড়া আলোচক হিসেবে উপসি’ত ছিলেন জনাব ফরিদা পারভীন- বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী, জনাব শামিমা বেগম- ডেপুটি পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি এবং ওয়াসফিয়া নাজনীন- এভারেস্ট বিজয়ী প্রথম নারী ও ব্র্যাকের শুভেচ্ছা দূত।
সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ফোরাম সম্পাদক জনাব নাছিমা আক্তার জলি। তিনি বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের উদ্যোগে প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত হচ্ছে। এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়, জাতিসংঘ ১১ অক্টোবরকে কন্যাশিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে।’ তিনি বলেন, ‘শিশু কন্যার বিয়ে নয়- করবে তারা বিশ্ব জয়’ এ প্রতিপাদ্য নিয়ে এ বছর একযোগে ৫৪৩টি স’ানে, ৫০টি জেলায়, ৩২৯টি ইউনিয়নে দিবসটি পালিত হচ্ছে।’ এসব কর্মসূচির সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানান তিনি। ফোরাম সম্পাদক বলেন, গৃহ পরিচারিকা আদুরীকে যারা পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করেছে তাদেরকে দৃষ্টান-মূলক শাসি- দিতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে আর কোন কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার না হয়।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেহের আফরোজ চুমকী বলেন, ‘বর্তমান সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কন্যাশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। নারীদের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাউথ সাউথ পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘আর কোন কন্যাশিশু যাতে আদুরীর মত নির্যাতনের শিকার না হতে হয়, সেজন্য অপরাধীদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের উপযুক্ত শাসি- বিধান করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষায় আমাদের পরিবারগুলোকে সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে। তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।’
জনাব তারিক-উল ইসলাম বলেন, ‘আজকে দেশের একটি কুপমন্ডক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী চায় না আমাদের নারীরা উন্নতি করুক। তাদের বিরুদ্ধে আজ দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে এবং একযোগে সারাদেশে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।’ তিনি বলেন ‘বর্তমান সরকার কন্যাশিশুদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা চাই আমাদের কন্যাশিশুরা সারাবিশ্বে ছড়িড়ে পড়-ক।’ এ সময় তিনি কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা পালনের জন্য জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামকে ধন্যবাদ জানান এবং ফোরামের সকল কর্মকাণ্ডে মন্ত্রণালয়ের সহায়তা থাকবে বলেও জানান তিনি।
জনাব শেখ আব্দুল আহাদ বলেন, ‘আমরা যদি ভালো জাতি গঠন করতে চাই, তাহলে ভালো মা প্রয়োজন। আর ভালো মা পেতে কন্যাশিশুদের আদর, সোহাগ দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। আর এটা একটা সার্বিক প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার সাথে বর্তমানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় যুক্ত রয়েছে। এর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকেও দায়িত্ব পালন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আজকে সরকারের পক্ষ থেকে ডিগ্রী পর্যন- মেয়েদের উপবৃত্তি দেওয়া ও তাদের সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটানো লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যেখানে পথশিশুদেরও অন-র্ভুক্ত করা হয়েছে।’ এর মাধ্যমে আমাদের কন্যাশিশু তথা নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে বলেও মন-ব্য করেন তিনি।
জনাব মিলি বিশ্বাস বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪৫ শতাংশ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। আবার এ শিশুদের ৪৮ শতাংশই হলো কন্যাশিশু। তাদের জন্য বিনিয়োগ করা আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার।’ তিনি বলেন, ‘কন্যাশিশুদের উন্নয়নে ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন’ কিছুতেই যেন বঞ্চনা ও নির্যাতন থামছে না।’ এ অবস’ার পরিবর্তনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সবাইকে ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি।
জনাব ফরিদা পারভীন বলেন, ‘আমাদের কন্যাশিশুদের আদর যত্ন দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। তাদের বাসায় একা রেখে চলে যাওয়া ঠিক হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকে শক্তি দেখিয়ে নারীদের ঘরের ভিতর আবদ্ধ রাখার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তাদের ভয় পেলে চলবে না। বরং সাহসের সাথে এগিয়ে যেতে হবে।’ তাহলেই নারী মুক্তি সম্ভব হবে বলে মন-ব্য করেন তিনি।
জনাব শামিমা বেগম বলেন, ‘কন্যাশিশুরা শিশুবিবাহের শিকার হলে অল্প বয়সেই তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। তারা শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তবে আশার কথা হলো- বর্তমান সরকার কন্যাশিশুদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। কন্যাশিশু ও নারীদের উন্নয়নে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।’ কন্যাশিশুদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবাইকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, দৈহিক ও মানসিকভাকে ফিট থাকতে হবে, মোবাইল নিয়ে ব্যস- থাকার পরিবর্তে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং নিয়মিত ডাইরি লিখতে হবে।’
এভারেস্ট বিজয়ী প্রথম নারী ওয়াসফিয়া নাজনীন বলেন, ‘আমরা অনেক পরিশ্রম করে এগিয়ে যাচ্ছি। অথচ আজকে আমাদের বলা হয়- বিয়ে করে ফেল, তাহলে স্বামী তোমার দায়িত্ব নেবে।’ এ ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়া দরকার বলে মন-ব্য করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তরুণ উদ্যোক্তা সাবিরুলের মত আজ কন্যাশিশুদেরকেও এগিয়ে যেতে হবে। তাদের প্রমাণ করতে হবে যে, মেয়েরাও পারে।’ এ সময় তিনি দিবসের প্রতিপাদ্যের গুরত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘অল্প বয়সেই কন্যাশিশুদের বিয়ে হয়ে গেলে তারা কম ওজনের সন-ান জন্ম দেয়। যার মাধ্যমে শুধু কন্যারা নয়, বরং পরিবার ও সমাজ ক্ষতিগ্রস- হয়। তাই সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে শিশুবিবাহ বন্ধ করতে হবে।’

উল্লেখ্য যে, অনুষ্ঠানের বিশেষ এক পর্যায়ে জাতীয় কন্যাশিশু দিবসকে কেন্দ্র করে জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘কন্যাশিশ-৯’ বই ও পোষ্টারের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এ ছাড়া আলোচনা সভায় উপসি’ত দু’জন কন্যাশিশু সিলভিয়া হামিদা ও প্রেমা দাস তাদের অনুভুক্তি ব্যক্ত ও বেড়ে ওঠার তুলে ধরে।

Advertisements