গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

_DSC0108জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম এবং উইমেন এন্ড গার্লস লিড গ্লোবাল এর আয়োজনে আজ ২ অক্টোবর ২০১৩, জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ’Preventing Child Marriage and Keeping Girls at School’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বক্তাগণ শিশুবিবাহকে বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাই শিশুবিবাহ রোধে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তারা।
জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব আয়েশা খানম- সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ম. হামিদ- মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন। এতে মুল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন জনাব মাহমুদ হাসান- কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর, উইমেন এ্যান্ড গার্লস লিডস গ্লোবাল। নির্ধারিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আমেনা মহসীন- অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন- অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জনাব মাহমুদা রহমান খান- সিনিয়র প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিষ্ট, ইউএসএইড, জনাব ওবায়দুর রব পিএইচডি- সিনিয়র এসোসিয়েট এ্যান্ড কান্ট্রি ডিরেক্টর, পপুলেশন কাউন্সিল, সুং হিয়ং লি- কান্ট্রি ডিরেক্টর, গুডনেইবারস্‌ বাংলাদেশ, জনাব মাহমুদুল কবির, কান্ট্রি ডিরেক্টর, টেরে দেস হোমস-নেদারল্যান্ডস, ডা. সাইদুল আলম- প্রধান সমন্বয়কারী, এডুকেশন, হেলথ এ্যান্ড চাইল্ড ওয়েলফেয়ার, ইসলামিক রিলিফ, জনাব জিন্নাত আফরোজ- প্ল্যান বাংলাদেশ ও জনাব এলি আদেলম্যান- গ্লোবাল কো-অর্ডিনেটর, উইমেন এ্যান্ড গার্লস লিডস গ্লোবাল, কাজী বেবী- সেক্রেটারী জেনারেল, ডন ফোরাম।
মুল প্রবন্ধ উপস’াপক জনাব মাহমুদ হাসান বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে গ্রামীণ কৃষি, তৈরি পোশাক খাত, এমডিজির লক্ষ্য অর্জনে সফলতা, ধারাবাহিকভাবে ৬% ডিজিপি অর্জন ইত্যাদি কারণে আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আর এ জায়গাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে আমাদের নারীরা। কিন’ একই সময়ে ৬৬% কন্যাশিশু শিশুবিবাহের শিকার, যা আমাদের সার্বিক উন্নয়নের পথে একটি বড় অন-রায়। কারণ শিশুবিবাহের বিপুল সংখ্যক কন্যাশিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। তারা বঞ্চিত হয় পুষ্টিসহ অন্যান্য অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে।’ এক্ষেত্রে তিনি তার ব্যক্তিগত কাজের অভিজ্ঞতা থেকে শিশুবিবাহ রোধের বিভিন্ন উপায় তুলে ধরেন।
জনাব আয়েশা খানম বলেন, শিশুবিবাহ যাতে বন্ধ হয় এবং কন্যাশিশুরা যাতে স্কুলে থাকে সেজন্য দীর্ঘদিন ধরে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের প্রচেষ্টার কারণে শিশুবিবাহ ও যৌতুক সমস্যা এখন অনেক কমে এসেছে। বর্তমানে এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী। তবে সমন্বিতভাবে এ কাজ করতে হলে আমাদেরকে একে অপরের সহযোগী হতে হবে। আমরা যদি শিশুবিবাহ বন্ধে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারি, তাহলে আগামী এক দশকে পরিসি’তি আরও উন্নত হবে।’ এ সময় তিনি কন্যাশিশুদের অগ্রগমনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করার জন্য কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামকে ধন্যবাদ জানান। নারীর অগ্রগমনে এতদিন ধরে যে গবেষণা কাজগুলো হয়ে আসছে, সেখান থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে ভবিষ্যতের কর্ম পরিকল্পনা নিতে হবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘শিশুবিবাহের কারণে কিশোরীরা জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কে বাধ্য হয়, যা কিশোরীদের মানসিক স্বাসে’্যর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আর শিশুবিবাহের সাথে জড়িত সমস্যা শুধু গর্ভবর্তী মা ও ভ্রুণকেই ক্ষতিগ্রস- করে না, শিশুর জন্মের পরও তা অব্যাহত থাকে। শিশুবিবাহের শিকার হওয়া নারীরা শতকরা ৪৫ ভাগ কম ওজন ও খর্বাকৃতির (ঝঃঁহঃবফ) শিশুর জন্ম দেয়। আর এই দুর্বল ও পুষ্টিহীন শিশুরা জাতির ভবিষ্যত অগ্রগতির জন্য বাধার কারণ হতে পারে। তাই শিশুবিবাহ বন্ধে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
জনাব ম. হামিদ বলেন, ‘শিশুদের ব্যাপারে মিডিয়া সুপরিকল্পিত অনুষ্ঠান করছে না। শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। পরিবার, সমাজ ও জাতিগঠনমূলক অনুষ্ঠান তৈরি ও পরিবেশন করা হচ্ছে না। তাই মিডিয়া সংশ্লিষ্টদের এ মানসিকতা বদলাতে হবে।’ শিশুদের বিশেষত কন্যাশিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে বহুমুখী দৃষ্ঠিভঙ্গি দরকার বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক আমেনা মহসীন বলেন, ‘কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে শিশুবিবাহ ঠেকানো যাবে না। রাষ্ট্র কন্যাশিশু এবং মেয়েদের যথাযথ নিরাপত্তা দিতে পারছে না, কারণ আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো সেভাবে গড়ে উঠেনি। অনেকদিন ধরে চলে আসা আমাদের কিছু ভ্রান- মূল্যবোধ আছে, সেগুলো বদলাতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করতে হবে। ধর্মীয় নেতা, স্কুলের শিক্ষক শিশুবিবাহের কুফল সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। যাতে তারাও শিশুবিবাহ রোধে পদক্ষেপ নিতে পারে।’
ড. মাহবুবা নাসরীন বলেন, ‘শিশুবিবাহ রোধ করতে হলে কন্যাশিশুদের সামাজিক নিরাপত্তা, প্রচলিত সামাজিক ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘শিশুবিবাহের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বেশিরভাগ গবেষণাই ইংরেজিতে। আরও বেশি মানুষকে সচেতন করে তোলার জন্য এগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে বাংলাতেও প্রচার করা উচিত।’
ড. সাইদুল আলম বলেন, ‘পরিবারগুলো বিয়েকেই মেয়েদের জন্য নিরাপত্তার মাধ্যম বলে ভাবে। এ মনোভাবকে ভাঙ্গার জন্য কাজ করতে হবে। শিশুবিবাহ রোধে নারী-পুরুষের পাশাপাশি আমাদের তরুণ প্রজন্মকেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। কারণ ছোট বয়সেই ইতিবাচক মূল্যবোধ তাদের মনে গেঁথে দিতে পারলে তাদের মনকে বদলে দেয়া সম্ভব।’
কাজী বেবী বলেন, ‘শিশুবিবাহ এখন গ্লোবাল ইস্যু। বিশ্বব্যাপীই অভিভাবকদের ধারণা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিতে পারলে সে নিরাপদ জীবনে প্রবেশ করবে। আমরা বাংলাদেশীরা দ্রুত এগোচ্ছি মেয়েদের অগ্রগমনের কাজে।’ তিনি বলেন, ‘শিশুবিবাহ রোধ করতে চাইলে শাসি-র বিধান বাড়াতে হবে এবং শাসি- নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া দুর্নীতির মাধ্যমে ভূয়া জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট নেয়া প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।’
ড. ওবায়দুর রব বলেন, ‘আমরা গত ১৫ বছর কাজ করে বিবাহের গড় বয়স ১৫ থেকে ১৬ তে উন্নীত করতে পেরেছি। শিশুবিবাহ বন্ধ করতে হলে কন্যাশিশুদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’
উইমেন এন্ড গার্লস লিড গ্লোবালের মিস এলি বলেন, ‘নারীরা পৃথিবীর সব জায়গায় বঞ্চিত। নারীদের এ অধস-ন অবস’ার অবসান ঘটাতে হবে। বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান শিশুবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করছে।’ তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, গবেষণা অভিজ্ঞতাগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে এগিয়ে নেবে এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই বলে মন-ব্য করেন তিনি।
মাহমুদা রহমান খান বলেন, শহরাঞ্চলে ৫৩% এবং গ্রামাঞ্চলে ৭০% শিশুবিবাহ হয়। কন্যাশিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে উত্যক্ত হয়, শিক্ষক কর্তৃক লাঞ্চিত হয়। এ জন্য পারিবারিকভাবে ছেলেদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র শিশুবিবাহ রোধ নয়, যেসব সকল কন্যাশিশুদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে তাদেরকে অর্তনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে।’
জিনাত আফরোজ বলেন, শিশুবিবাহ মানবাধিকারের ব্যত্যয় ঘটায়। আমরা অনেক সময় বিবাহের অনুষ্ঠানে বাধা দেই। এটা অনেক সময় নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। আমরা চাই এমন একটা পরিবেশ, যেখানে অভিভাবকরা সচেতন হয়ে ১৮ বছরের আগে তাদের কন্যাশিশুদের বিয়ে দেবে না।’ শিশুবিবাহ রোধে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে বলেও মন-ব্য করেন তিনি।

Advertisements