
কন্যাশিশুদের প্রতি যে কোনো অবহেলা হবে জাতির জন্য আত্মঘাতি: ড. বদিউল আলম মজুমদার
‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ নামে একটি আইন জরুরি ভিত্তিতে প্রণয়ন করা এবং শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সকল ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা-সহ কন্যাশিশুদের কল্যাণে একগুচ্ছ সুপারিশ তুলে ধরেছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। আজ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, সকাল ১১.টায়, জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম-এর আয়োজনে এবং এডুকো বাংলাদেশ-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উক্ত সুপারিশগুলো তুলে ধরা হয়। জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত উক্ত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্র্রেক্ষাপটে ফোরাম কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ‘কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতার চিত্র পর্যবেক্ষণ-২০২৪’ তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার, সভাপতি, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। বক্তব্য রাখেন জনাব শাহীন আক্তার ডলি, সহ-সভাপতি, জাতীয় কন্যাশিশূ অ্যাডভোকেসি ফোরাম ও নির্বাহী পরিচালক, নারীমৈত্রী, জনাব মাঈনুদ্দিন মাইনুল, কান্ট্রি ডিরেক্টর, গুড নেইবারস বাংলাদেশ, জনাব মো. শহীদুল ইসলাম, ¯েপশালিস্ট, চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড প্রোটেকশন, এডুকো বাংলাদেশ, হালিমা আক্তার, ম্যানেজার, পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি, এডুকো বাংলাদেশ প্রমুখ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডাব্লিউএলএ) নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম-এর ন্যাশনাল কোঅর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান (এ্যানী)।
উল্লেখ্য, ‘জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম’ কন্যাশিশু তথা নারীর অবস্থা ও অবস্থানের ইতিবাচক পরিবর্তনে কর্মরত সমমনা সরকারি-বেসরকারি ২০৬টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্ল্যাটফম। প্ল্যাটফর্মটি ২০০২ সাল থেকে নারী এবং কন্যাশিশুর অধিকার, তাদের সুরক্ষা-সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অন্যদিকে এডুকো বাংলাদেশ একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, বাংলাদেশে ১৯৯৯ সাল থেকে শিশুদের শিক্ষা, সুরক্ষা ও সার্বিক উন্নয়নে সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘কন্যাশিশুরা আমাদের সম্পদ, তারা কোনোভাবেই বোঝা নয়। কন্যাশিশুদের প্রতি যথাযথ বিনিয়োগের অভাবে তারা অপুষ্টির শিকার হচ্ছে এবং তাদের অনেকেই মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মূলত বাল্যবিবাহের কারণে আমাদের কন্যাশিশুদের অনেকেই অল্প বয়সেই মা হয়ে যান। এরফলে তারা অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেন, জাতি আকারে যার মাশুল দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা দেখেছি, চীন ও জাপানের মানুষ আগে অনেক খাঁটো ছিল, এখন পুষ্টি নিশ্চিত করার কারণে তাদের সেই অবস্থা আর নেই। তাই আমরা যদি কন্যাশিশুদের প্রতি বঞ্চনা করি, তাদের জন্য যথাযথ বিনিয়োগ না করি, যদি জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উদযাপনের মাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি না করি, তাহলে আমাদের কন্যাশিশুরা পিছিয়ে পড়বে, যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য হবে আÍঘাতী।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের অ্যাডভোকেসির ফলে ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত হচ্ছে। আর ২০১১ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী আন্তজার্তিক কন্যাশিশু দিবস পালিত হচ্ছে। তাই কন্যাশিশুদের জন্য দিবস পালনের ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশ পথিকৃত।
শাহীনা আক্তার ডলি বলেন, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির সঙ্গেও আমরা আরও অনেকগুলো আইন প্রণয়ন করেছি। কিন্তু আমাদের নারী ও কন্যাশিশুরা এখনও নানাভাবে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তার মানে কি এই যে, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও আমরা নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য একটি বাসযোগ্য ও নিরাপদ সমাজ ও দেশ গড়ে তুলতে পারিনি?
অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ঘরে-বাইরে-স্কুলে কোথাও আমাদের নারী ও কন্যাশিশুরা নিরাপদ নয়। তারা নানাভাবে নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। অথচ যৌন হয়রানি রোধের বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। আমরা ফোরামের পক্ষ থেকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ বিষয়ক আইন পাসের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, যাতে এসব ঘটনা প্রতিরোধ করা যায় এবং ভুক্তভোগী আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। বাল্যবিবাহের বিশেষ ধারার ব্যবহার করে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন অভিভাবকরা। তাই আইনে কতগুলো বিষয়ে সু¯পষ্ট ধারণা থাকতে হবে, যাতে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে না পারে।
মাঈনুদ্দিন মাইনুল বলেন, বাংলাদেশই প্রথম জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালন করা শুরু করেছিল। তবুও আমাদের নারী ও কন্যাশিশুরা কেন এখনও বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং অবহেলার শিকার তা খতিয়ে দেখা উচিত। আমরা দেখছি, আগস্ট আন্দোলনে নারী ও কন্যাশিশুরা ভ‚মিকা পালন করেছে। কিন্তু তাদের ভ‚মিকা গণমাধ্যমে উপস্থাপিত হচ্ছে না। আমি মনে করি, শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর গঠন করা হলে এটি শিশুদের কল্যাণে ব্যাপকভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে। আমরা চাই আমাদের স্কুল-কলেজগুলো যেন মেয়েশিক্ষার্থীদের নিরাপদ হয়ে ওঠে। সেজন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, সরকারের পাশাপাশি আমাদের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং গণমাধ্যম নারী ও শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের কল্যাণে একটি উলেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করতে পারে। গণমাধ্যম যদি প্রতিমাসে কন্যাশিশু বিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে, তাহলে এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি নীতি-নির্ধারকরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবেন।
হালিমা আক্তার বলেন, সর্বস্তরে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন পাসের জন্য এবং শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আহŸান জানাচ্ছি। আমি মনে করি, কন্যাশিশুদের প্রতি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম উলেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করতে পারে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানী বলেন, ‘আমাদের সমাজে নারী ও কন্যাশিশুরা প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এসকল সহিংসতাকে যদি সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে বলা যেতে পারে, তাদের ওপর নির্যাতন মূলত দুই ধরনের। প্রথমটি সামগ্রিকভাবে সমাজের মাধ্যমে নিপীড়িতদের একজন হিসেবে, দ্বিতীয় ধরনের নির্যাতন হলো কেবল কন্যাশিশু হিসেবে জন্মানোর ফলে। এ ধরনের সহিংসতাই মূলত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ পর্যালোচনা করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে নবজাতক কন্যাশিশু থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধাÑ কেউই আজ নিরাপদ নয়। ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) তথ্য বলছে, গত ২৩ বছরে সেখান থেকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় ৬২ হাজারের বেশি নারী ও শিশু সহায়তা পেয়েছে। মামলা হয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৪৪১টি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৬ থেকে সাড়ে ২২ হাজার মামলা হয়েছে। অন্যদিকে, অনলাইনেও হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন আমাদের নারী ও কন্যাশিশুরা।
তিনি বলেন, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৭০টি দৈনিক পত্রিকা (২৪টি জাতীয় দৈনিক, ৪৫টি স্থানীয় পত্রিকা, ৫টি অনলাইন) থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। জানু-আগস্ট এই ৮ মাসে মিডিয়া মনিটরিংয়ের চিত্র অনুযায়ী, এই সময়ে মোট ২৮ জন কন্যাশিশু যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে, ২২৪ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে ১৯ জন কন্যাশিশু, ১০ জন গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, ১৩৩ জন কন্যাশিশু আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে, ৮১ জন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে, ২০ জন কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে এবং চলতি বছরের প্রথম আটমাসে ১৮৭ জন কন্যাশিশুর পানিতে পড়ে মৃত্যুবরণের তথ্য পাওয়া গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলো হলো: ১. ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ নামে একটি আইন জরুরি ভিত্তিতে প্রণয়ন করা; ২. শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সকল ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা; ৩. ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ আসলে ধর্ষণের শিকার নারী ও কন্যার পরিবর্তে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করতে হবে যে, সে এ ঘটনা ঘটায়নি, এ সম্পর্কিত প্রচলিত আইনের বিধান সংশোধন করা; ৪. মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠনের কঠোর নির্দেশনা মনিটরিংয়ের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা; ৫. কন্যাশিশু নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করা; ৬. শিশু সুরক্ষায় শিশুদের জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তর গঠন করা; ৭. বাল্যবিবাহ বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারী বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা কার্যক্রম বৃদ্ধি করা; ৮. কন্যাশিশুদের প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির নেতিবাচক দিক থেকে তাদেরকে রক্ষার জন্য উচ্চপর্যায়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় সব ধরনের পর্নোগ্রাফিক সাইট বন্ধ করা; ৯. সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বাস্তবায়ন করা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা; ১০. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাজেট বৃদ্ধি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কন্যাশিশু ও তাঁদের অভিভাবকদের এর আওতায় আনা; ১১. ক্রমবর্ধমান কন্যাশিশু ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং পাশাপাশি তরুণ ও যুবসমাজকে সচেতনকরণসাপেক্ষে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাদেরকে যুক্ত করা।
